পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ও খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক নাসের হুসেইন। তাঁর মতে, দল গঠন ও ক্রিকেটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাকিস্তান এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা টেস্ট ক্রিকেটের প্রস্তুতি ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে সায়েম আয়ুবকে হঠাৎ টেস্ট দলে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (সিপিএল) খেলছিলেন সায়েম আয়ুব। সেখান থেকেই পাকিস্তানের টেস্ট দলে ডাক পান এই ব্যাটার। এরপর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এজবাস্টন টেস্টে ব্যাট হাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হন তিনি। ম্যাচের দুই ইনিংসেই শূন্য রানে আউট হয়েছেন সায়েম।
তাঁর এই পারফরম্যান্সকে অবশ্য শুধু একজন ব্যাটারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না নাসের। বরং সায়েমকে দলে নেওয়ার প্রক্রিয়াটিকেই পাকিস্তানের নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের বড় ভুল হিসেবে দেখছেন তিনি। নাসেরের মতে, টেস্ট ক্রিকেটে নামার আগে একজন খেলোয়াড়ের প্রস্তুতি, সাম্প্রতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা এবং নির্দিষ্ট কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি।
স্কাই স্পোর্টসকে দেওয়া বক্তব্যে নাসের বলেন, পাকিস্তানের পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। সায়েম আয়ুবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মনে করেন, দীর্ঘ সময় ফিল্ডিং করার পর হঠাৎ ব্যাটিংয়ে নেমে পুরোপুরি মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার একটি স্পষ্ট উদাহরণ এটি।
নাসেরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সায়েমের সাম্প্রতিক ক্রিকেট অভিজ্ঞতা নিয়ে। তিনি জানান, গত ১১ মাসে সায়েম কোনো প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেননি। অথচ টেস্ট দলে যোগ দেওয়ার মাত্র ১০ দিন আগেও তিনি সিপিএলে খেলছিলেন। অর্থাৎ, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ব্যস্ততা থেকে সরাসরি ইংল্যান্ডের টেস্ট পরিবেশে এসে তাঁকে ব্যাটিং করতে হয়েছে।
টেস্ট ক্রিকেটের সঙ্গে টি-টোয়েন্টির পার্থক্য শুধু ম্যাচের দৈর্ঘ্যে নয়। ব্যাটিংয়ের ধরন, ধৈর্য, শট নির্বাচনের সময়, বোলারদের মোকাবিলার কৌশল এবং মানসিক প্রস্তুতিতেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে ব্যবহৃত ডিউক বলও ব্যাটারদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। নাসেরের বক্তব্যের মূল জায়গাটি সেখানেই—সাম্প্রতিক সময়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট না খেলা একজন ক্রিকেটারকে এত দ্রুত ভিন্ন সংস্করণ ও ভিন্ন পরিবেশে টেস্টে নামানোর যৌক্তিকতা কী?
এ কারণেই সায়েমকে দলে নেওয়ার ঘটনাকে টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি অবহেলা হিসেবে দেখছেন নাসের। তাঁর মতে, টেস্ট দলে একজন খেলোয়াড়কে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সংস্করণের প্রস্তুতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
পাকিস্তানের সমস্যা অবশ্য শুধু সায়েমকে ঘিরে নয়। লর্ডস টেস্টের পর দলটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। সাত ক্রিকেটারকে বাদ দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তাঁদের জায়গায় আরও সাতজনকে দলে নেওয়া হয়, যাঁদের মধ্যে পাঁচজনই তখন পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেকের অপেক্ষায় ছিলেন।
কোচিং স্টাফেও আসে পরিবর্তন। দলের প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ এবং বোলিং কোচ উমর গুলকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এত বড় পরিবর্তনের পরও মাঠের পারফরম্যান্সে প্রত্যাশিত উন্নতি দেখা যায়নি। এজবাস্টনে সিরিজের শেষ টেস্টেও পাকিস্তান ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়ের শঙ্কায় পড়ে।
নাসেরের মতে, সিরিজের মাঝপথে এতজন ক্রিকেটারকে একসঙ্গে বাদ দেওয়া দলের ভেতরের আস্থার পরিবেশ নষ্ট করতে পারে। একজন খেলোয়াড় যখন দেখেন তাঁর সতীর্থ ও রুমমেটকে মাঝপথে দল থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
এমনকি আগের ম্যাচে পাঁচ উইকেট নেওয়া একজন বোলারকেও পরের ম্যাচে বাদ পড়তে হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন নাসের। তাঁর মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত খেলোয়াড়দের মধ্যে দলীয় স্বার্থের চেয়ে নিজেদের জায়গা ধরে রাখার চিন্তা বাড়িয়ে দিতে পারে।
নাসেরের বক্তব্যে তাই পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের একটি বড় দিক উঠে এসেছে—দলের ভেতরে স্থিরতা ও পারস্পরিক আস্থার অভাব। টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে ভালো করতে হলে শুধু প্রতিভাবান ক্রিকেটার থাকলেই হয় না; প্রয়োজন ধারাবাহিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং খেলোয়াড়দের প্রতি আস্থা।
সায়েম আয়ুবের দুই ইনিংসে শূন্য করা সেই বৃহত্তর সমস্যারই একটি উদাহরণ বলে মনে করছেন নাসের হুসেইন। তাঁর সমালোচনার কেন্দ্রে একজন ক্রিকেটারের ব্যর্থতা নয়, বরং পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটে খেলোয়াড় নির্বাচন, প্রস্তুতি এবং দল পরিচালনার পদ্ধতি। ধারাবাহিক পরিবর্তনের বদলে স্থিতিশীল পরিকল্পনা এবং টেস্টের জন্য যথাযথ প্রস্তুতির ওপর জোর না দিলে পাকিস্তানের এই সংকট কাটানো কঠিন হতে পারে—এমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক।









