রাজশাহীর সাহেববাজারে কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরির ঘটনায় সাতজন কথিত চোর এবং চোরাই স্বর্ণ কেনার অভিযোগে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীসহ আটজনকে গ্রেফতার করেছে রাজশাহী মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা। অভিযানে গ্রেফতার সাতজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকায় অভিযান চালিয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিউল হাসানকে গ্রেফতার করা হয়। তার হেফাজত থেকে চুরি যাওয়া ২৬ ভরি স্বর্ণ, ৬২ ভরি রূপা এবং চোরাই স্বর্ণ বিক্রির ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র উপপুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরির পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে চক্রটির সদস্যরা প্রায় চার মাস ধরে সাহেববাজার এলাকায় ঘোরাফেরা করেছিল। কখনো ব্যবসায়ী, আবার কখনো ক্রেতার পরিচয়ে তারা বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করে দোকান ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করে। দোকানে প্রবেশের সম্ভাব্য পথের পাশাপাশি চুরির পর নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার পথও তারা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
গত ১৯ জুন ভোরে পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল সাহেববাজারে কারুশ্রী জুয়েলার্সের সামনে অবস্থান নেয়। পুলিশ জানায়, তারা সেখানে বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রির দোকান বসিয়ে মানুষের জটলা তৈরি করে। পরে ওই দলের সদস্যরা পাশের একটি স্বর্ণের দোকানের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। সেই দোকানের ভেতর দিয়ে কারুশ্রী জুয়েলার্সের পশ্চিম পাশের দেয়াল কেটে মূল দোকানে ঢোকে তারা।
দোকানের সিন্দুক থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রূপা এবং নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় চক্রটি। মামলার এজাহারে দোকানের মালিক তুর্য সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ, ২ হাজার ২০০ ভরি রূপা, তিন বক্স স্বর্ণের নাকফুল এবং ২০ লাখ টাকা চুরি হয়। ঘটনার পর তিনি বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলা করেন।
মামলাটির তদন্তে রাজশাহী মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার পাশাপাশি সাইবার ইউনিট ও সিসি ক্যামেরা ইউনিট কাজ শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হয়।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, চক্রটির সদস্যরা পরিচয় গোপন রাখতে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করত। একটি মোবাইল ফোন একবারের বেশি ব্যবহার না করার পাশাপাশি তারা অন্য ব্যক্তিদের নামে নিবন্ধিত সিমকার্ড ব্যবহার করত বলে পুলিশ জানিয়েছে। এমনও দেখা গেছে, যাদের নামে সিমকার্ড নিবন্ধিত, তাদের কেউ কেউ নিজেদের নামে ওই সিম থাকার বিষয়টি জানতেন না। চক্রটির সদস্যরা দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে যেত এবং কোথাও দীর্ঘ সময় অবস্থান করত না।
তদন্তের একপর্যায়ে গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে বাগেরহাটের মোংলা থানার শেহলাবুনিয়া মোর্শেদ সড়ক গ্রামের রুস্তম আলী শেখকে খুলনা থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার মাধবপুরা (মাইল্যারহাট) গ্রামের স্বপন, একই গ্রামের উজ্জল, একই থানার মাধবপুরা গ্রামের রিয়াজ সুমন ওরফে গেদু, বাগেরহাটের শরণখোলা থানার খোন্তাকাটা (জিমতলা) গ্রামের আবু তালেব, একই থানার পূর্ব খোন্তাকাটা গ্রামের কালাম শেখ এবং পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার মাধবপুরা (মাইল্যারহাট) গ্রামের ইউনুস।
পুলিশ জানায়, পরে গ্রেফতার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরাই স্বর্ণ কেনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিউল হাসানকে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়। চাঁদপুরের কচুয়া থানার সরকার বাড়ী বড়নীখোলা গ্রামের রফিক উদ্দিনের ছেলে রবিউলের হেফাজত থেকে ২৬ ভরি চুরি যাওয়া স্বর্ণ, ৬২ ভরি রূপা এবং চোরাই স্বর্ণ বিক্রির ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেফতারের পর অসুস্থ হয়ে পড়ায় রবিউল হাসানকে পুলিশ পাহারায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পুলিশের তদন্তে এখন চুরি যাওয়া বাকি মালামাল উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ মামলার এজাহারে উল্লেখ করা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রূপার তুলনায় এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সামগ্রীর পরিমাণ কম। ফলে চক্রটির সদস্যরা চুরি করা অন্য মালামাল কোথায় সরিয়ে রেখেছে বা কার কাছে বিক্রি করেছে, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার এবং চুরি যাওয়া বাকি মালামাল উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতার আটজনকে বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করার কথা রয়েছে।
তদন্তের পরবর্তী ধাপে গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে চুরির পরিকল্পনা, সংঘবদ্ধভাবে অভিযান পরিচালনা, চোরাই মালামাল বিক্রি এবং এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয়ে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করবে পুলিশ। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।









