নিজস্ব প্রতিবেদক,
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পদত্যাগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো। এর মধ্যে চীন সফরসংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের অর্থমূল্য ছিল মাত্র ৯০১ মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার টাকা*।
তবে পুতুল বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর আইনজীবীদের ৩ জুলাই ২০২৬-এর চিঠি অনুযায়ী, চীন সফরের অর্থসংক্রান্ত বিষয়টি কোনো ব্যক্তিগত আর্থিক জালিয়াতি নয়; বরং নিয়মিত ভ্রমণ ব্যয়ের অর্থ ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুল (administrative oversight) থেকে বিষয়টির সৃষ্টি হয়।
মাত্র ৯০১ ডলারের অভিযোগ, অথচ তদন্তের দাবি ছিল পুতুলেরঃ
অভিযোগ ওঠার পর পুতুল তাঁর আইনজীবীদের মাধ্যমে WHO-কে বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করার অনুরোধ জানান। তাঁর অবস্থান ছিল—অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করা হোক।
কিন্তু তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে দূরে ছিলেন এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন ও যথাযথ তদন্তের প্রত্যাশা করলেও সন্তোষজনক কোনো প্রক্রিয়া দেখতে পাননি।
শেষ পর্যন্ত বুধবার তিনি WHO-এর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুসের কাছে পদত্যাগপত্র দেন। পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, তাঁকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার কারণে WHO নেতৃত্বের ওপর তাঁর আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানান, প্রায় এক বছর অবৈতনিক ছুটিতে থাকার কারণে তাঁর আর্থিক অবস্থাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘সার্টিফিকেট জালিয়াতি’- নাকি যোগ্যতার ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন?
পুতুলের বিরুদ্ধে আলোচিত আরেকটি অভিযোগ হলো তাঁর ‘academic credentials misrepresentation’-অর্থাৎ শিক্ষাগত যোগ্যতা ভুলভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ।
এখানেও একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, WHO-এর অভিযোগে তাঁর কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিকে সরাসরি জাল বা ভুয়া সার্টিফিকেট বলা হয়নি বরং তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটিই অভিযোগের বিষয় হিসেবে এসেছে। পুতুলের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া একটি ‘honorary doctorate’- এর বিষয়টি WHO-এর মহাপরিচালককে আগেই জানানো হয়েছিল।
পুতুলের দীর্ঘদিনের পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। WHO-এর নিজস্ব ওয়েবসাইটে তাঁকে মানসিক স্বাস্থ্য ও অটিজম বিষয়ে কাজ করা একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। WHO-তে যোগ দেওয়ার আগে তিনি সংস্থাটির মহাপরিচালকের ‘মানসিক স্বাস্থ্য ও অটিজম বিষয়ক উপদেষ্টা’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং WHO-এর মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্যানেল-এর সদস্য ছিলেন।
জমি নিয়েও অভিযোগঃ
পুতুলের পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, WHO তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একটি জমি অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগও তুলেছিল।
তাঁর বক্তব্য, জমিটি তিনি WHO-তে যোগ দেওয়ার আগেই অর্জন করেছিলেন এবং বাংলাদেশের একটি বিশেষ আইনের আওতায় ওই সম্পত্তির অধিকার তাঁর ছিল। ফলে তাঁর দাবি অনুযায়ী, WHO-তে দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে জমি অর্জনের অভিযোগকে যুক্ত করার সুযোগ নেই।
এক বছর অবৈতনিক ছুটির পর পদত্যাগঃ
সায়মা ওয়াজেদ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে WHO-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত এই পদটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণী পদ।
তবে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে তাঁকে ছুটিতে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে তিনি প্রায় এক বছর কোনো পারিশ্রমিক পাননি বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন। এই অবস্থায় অভিযোগগুলোর একটি স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে তিনি WHO কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার যোগাযোগ করেছিলেন বলে তাঁর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই পুতুলের পদত্যাগঃ
সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের অনেকে এটিকে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরিণতি হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থী ও তাঁর সমর্থকদের একটি অংশ মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে অভিযোগের মুখে থেকে এবং স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে সাড়া না পাওয়ার পর পদত্যাগের মাধ্যমে পুতুল তাঁর আত্মসম্মান ও ব্যক্তিগত অবস্থান বজায় রেখেছেন।
তবে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বাইরে একটি বিষয় স্পষ্ট- ৯০১ ডলারের ভ্রমণ ব্যয়সংক্রান্ত অভিযোগটি নিজেই প্রমাণ করে না যে সায়মা ওয়াজেদ ব্যক্তিগতভাবে ওই অর্থ আত্মসাৎ বা জালিয়াতি করেছেন। তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি ছিল একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুল এবং পুতুল নিজেই অভিযোগটির যথাযথ তদন্ত চেয়েছিলেন। সেই তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়া কোনো অভিযোগকে প্রমাণিত দুর্নীতি হিসেবে উপস্থাপন করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অভিযোগকে একেবারে অগ্রাহ্য করাও সমানভাবে যুক্তিসঙ্গত নয়।









