দেশের জীবন বিমা খাতে সামগ্রিক ব্যবসা বাড়লেও একাধিক কোম্পানি দীর্ঘ সময় ধরে বিপরীত চিত্র দেখাচ্ছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য তুলনা করে দেখা গেছে, অন্তত ১৩টি জীবন বিমা কোম্পানির ব্যবসা এবং জীবন তহবিল—দুই ক্ষেত্রেই সংকোচন হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একই সঙ্গে নতুন ব্যবসা কমে যাওয়া এবং জীবন তহবিল ক্ষয়ে যাওয়ার প্রবণতা কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর সতর্কসংকেত।
এই পরিস্থিতিকে জীবন বিমা খাতের বিশেষজ্ঞরা রূপক অর্থে ‘ক্যানসার আক্রান্ত’ অবস্থার সঙ্গে তুলনা করছেন। তাদের ব্যাখ্যা, একটি কোম্পানির ব্যবসা যদি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে এবং একই সময়ে গ্রাহকদের ভবিষ্যৎ দায় মেটানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জীবন তহবিলও কমে যায়, তাহলে সমস্যাটি শুধু সাময়িক ব্যবসায়িক মন্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়মতো কারণ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সংকট আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত ব্যবসার পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ১০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় বছরে সামগ্রিক বাজারে ব্যবসা বেড়েছে ৩ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির মধ্যেও কিছু প্রতিষ্ঠান ক্রমাগত পিছিয়ে পড়েছে।
| কোম্পানি | ২০২০ সালের ব্যবসা | ২০২৫ সালের ব্যবসা | ব্যবসার পরিবর্তন | ২০২০ সালের জীবন তহবিল | ২০২৫ সালের জীবন তহবিল |
|---|---|---|---|---|---|
| মেঘনা লাইফ | ৪২২ কোটি | ২৮৩ কোটি | কমেছে ১৩৯ কোটি | ১,৮৯০ কোটি | ১,৫৭০ কোটি |
| পপুলার লাইফ | ৫৯১ কোটি | ৫০১ কোটি | কমেছে ৯০ কোটি | ১,৭৫২ কোটি | ১,৪৯২ কোটি |
| ফারইস্ট ইসলামী লাইফ | ৯৭৪ কোটি | ২৮৩ কোটি | কমেছে ৬৯১ কোটি | ২,০০৩ কোটি | ঋণাত্মক ৮৪৭ কোটি |
| প্রাইম লাইফ | ৪১৪ কোটি | ৩৮৮ কোটি | কমেছে ২৬ কোটি | ৮৩৭ কোটি | ৭৪৪ কোটি |
| রূপালী লাইফ | ২৪৮ কোটি | ২১৫ কোটি | কমেছে ৩৩ কোটি | ৫০৫ কোটি | ৫০৫ কোটি |
| সানফ্লাওয়ার লাইফ | ৬৫ কোটি | ১৫ কোটি | কমেছে ৫০ কোটি | ১৩৮ কোটি | ৮৮ কোটি |
| হোমল্যান্ড লাইফ | ১০১ কোটি | ৯ কোটি | কমেছে ৯২ কোটি | ২৬১ কোটি | ১৬৮ কোটি |
| গোল্ডেন লাইফ | ২৪ কোটি | ১৭ কোটি | কমেছে ৭ কোটি | ২৬১ কোটি | ১৬৮ কোটি |
| পদ্মা লাইফ | ৪৯ কোটি | ১৫ কোটি | কমেছে ৩৪ কোটি | ১৩ কোটি | ঋণাত্মক ৩০৯ কোটি |
| বায়রা লাইফ | ৪ কোটি | ২ কোটি | কমেছে ২ কোটি | ৬৬ কোটি | ঋণাত্মক ৬৫ কোটি |
| সান লাইফ | ১০৫ কোটি | ১৯ কোটি | কমেছে ৮৬ কোটি | ১৮২ কোটি | ৪৯ কোটি |
| প্রগ্রেসিভ লাইফ | ৪২ কোটি | ৩০ কোটি | কমেছে ১২ কোটি | ২৭৩ কোটি | ৬৯ কোটি |
| প্রটেক্টিভ লাইফ | ৩৯ কোটি | ৩১ কোটি | কমেছে ৮ কোটি | ১০ কোটি | ১ কোটি |
সবচেয়ে বড় ধাক্কা দেখা গেছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির ব্যবসা ছিল ৯৭৪ কোটি টাকা। পাঁচ বছর পর তা কমে ২৮৩ কোটি টাকায় নেমেছে। একই সময়ে ২ হাজার ৩ কোটি টাকার জীবন তহবিল কমে ঋণাত্মক ৮৪৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
মেঘনা লাইফের ব্যবসা ৪২২ কোটি টাকা থেকে কমে ২৮৩ কোটি এবং জীবন তহবিল ১ হাজার ৮৯০ কোটি থেকে ১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকায় নেমেছে। পপুলার লাইফের ব্যবসা ৫৯১ কোটি থেকে কমে ৫০১ কোটি টাকা হয়েছে। জীবন তহবিলও ১ হাজার ৭৫২ কোটি থেকে কমে ১ হাজার ৪৯২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ছোট ও নতুন কিছু প্রতিষ্ঠানের অবস্থাও উদ্বেগজনক। হোমল্যান্ড লাইফের ব্যবসা ১০১ কোটি টাকা থেকে মাত্র ৯ কোটিতে নেমে এসেছে। পদ্মা লাইফের জীবন তহবিল ১৩ কোটি টাকা থেকে ঋণাত্মক ৩০৯ কোটি টাকায় চলে গেছে। বায়রা লাইফের ক্ষেত্রেও ৬৬ কোটি টাকার জীবন তহবিল ঋণাত্মক ৬৫ কোটিতে নেমেছে। প্রটেক্টিভ লাইফের জীবন তহবিল ১০ কোটি টাকা থেকে কমে মাত্র ১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে ব্যবসা কমার পেছনে অতীতের অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, গ্রাহকের বিমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা এবং সামগ্রিক আস্থার সংকটের কথা বলা হয়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবও রয়েছে বলে তারা মনে করেন। নতুন ব্যবসা ও নবায়ন কমে গেলেও পুরোনো পলিসির দাবি পরিশোধ করতে হওয়ায় জীবন তহবিল থেকে অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন অর্থপ্রবাহ কমার বিপরীতে দায় পরিশোধ অব্যাহত থাকায় তহবিল সংকুচিত হচ্ছে।
মেঘনা লাইফের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিনের মতে, দীর্ঘদিনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত ব্যয় এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের প্রভাব এখন অনেক প্রতিষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে কিছু কোম্পানি গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ ভবিষ্যৎ দায়ের কথা যথেষ্ট বিবেচনায় না নিয়ে অফিস, গাড়ি ও বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় করেছে। ফলে পলিসির অর্থ পরিশোধের সময় প্রয়োজনীয় তহবিলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মেঘনা লাইফের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে রয়েছে। ফলে প্রয়োজনের সময় ওই অর্থ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। জীবন তহবিল কমার আরেকটি কারণ হিসেবে তিনি পুরোনো পলিসির দাবি পরিশোধের বিষয়টি উল্লেখ করেন। নতুন ব্যবসা কমলেও পুরোনো গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করতে হওয়ায় তহবিল থেকে অর্থ বেরিয়ে গেছে।
তবে পুরো জীবন বিমা খাত একই সংকটে আছে—এমন চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে না। একই সময়ে বেশ কিছু কোম্পানি ব্যবসা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। জাতীয় জীবন বিমার ব্যবসা ২০২০ সালের ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা থেকে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকায় উঠেছে। ডেল্টা লাইফের ব্যবসা ৭৩২ কোটি থেকে বেড়ে ১ হাজার ১৯ কোটি এবং প্রগতি লাইফের ৩১৯ কোটি থেকে বেড়ে ৬৬৭ কোটি টাকা হয়েছে। সোনালী লাইফ ও গার্ডিয়ান লাইফের ব্যবসাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
প্রগতি লাইফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জালালুল আজিম মনে করেন, জীবন বিমা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও জীবন তহবিল দীর্ঘমেয়াদে বাড়াই স্বাভাবিক। কোনো কোম্পানির দুটো সূচকই যদি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, তাহলে সেখানে ব্যবস্থাপনা, দাবি পরিশোধ, বিনিয়োগ কিংবা গ্রাহকের আস্থার জায়গায় সমস্যা রয়েছে কি না, তা দ্রুত খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার ফল ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে। তাই সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত কারণ শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তা না হলে ব্যবসা হারানোর পাশাপাশি গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের সক্ষমতাও আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
জীবন বিমার ক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে কোম্পানির সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি। একটি পলিসির দায় অনেক বছর পর পরিশোধ করতে হয়। তাই শুধু বর্তমান বছরের ব্যবসা নয়, ভবিষ্যৎ দায় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত তহবিল ও আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখাই প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্বের অন্যতম শর্ত। এই জায়গায় ধারাবাহিক অবনতি দেখা দিলে তা গ্রাহক ও পুরো জীবন বিমা খাতের জন্যই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।










