বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে কিছু বিরল ব্যক্তিত্ব থাকেন, যাঁদের অবদান কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় বাঁধা যায় না। তাঁরা একাধারে রাষ্ট্রের দক্ষ চালক, সততার প্রতীক এবং নাগরিক সমাজের বিবেকের কণ্ঠস্বর। ড. আকবর আলি খান ছিলেন তেমনই এক ক্ষণজন্মা জনবুদ্ধিজীবী। তিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, দূরদর্শী প্রশাসক, সমাজ বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদ। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ এক অমূল্য মেধা ও নৈতিকতার কান্ডারিকে হারায়।
১৯৪৪ সালে তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে জন্মগ্রহণ করেন আকবর আলি খান। শিক্ষাজীবনে অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর শিক্ষা ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (সিএসপি)-এ যোগ দিয়ে তিনি পেশাগত জীবনে সততা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। তখন তিনি হবিগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে তিনি আমলাতান্ত্রিক নিরাপত্তার গণ্ডি পেরিয়ে মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সরকারি নির্দেশের তোয়াক্কা না করে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় অর্থ তুলে দেন। কেবল তা-ই নয়, সরকারি তহবিল থেকে প্রায় তিন কোটি টাকা ট্রাকে করে সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলায় পৌঁছে দেন, যা যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে ও শরণার্থী শিবিরের ব্যবস্থাপনায় বড় ভূমিকা রাখে। এই সাহসিকতার জন্য তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল।
স্বাধীনতার পর ড. আকবর আলি খান রাষ্ট্র পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনআরবি) চেয়ারম্যান, অর্থসচিব এবং প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটকালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। তবে নীতিগত মতপার্থক্য ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করে নিজের সুদৃঢ় নীতিনিষ্ঠতার প্রমাণ দেন। পরবর্তীতে তিনি রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারি দায়িত্ব থেকে অবসরের পর ড. আকবর আলি খান পূর্ণাঙ্গভাবে লেখক ও গবেষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কঠিন অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক তত্ত্বকে প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় ভাষায় সাধারণ পাঠকের কাছে তুলে ধরার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’, ‘আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি’, ‘ডিসকভারি অব বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশে বাজেট রাজনীতি’ এবং তাঁর আত্মজীবনী ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ বাংলা সাহিত্য ও রাষ্ট্রচিন্তার অমূল্য সংযোজন।
ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেও তিনি কখনো সত্য বলা থেকে পিছিয়ে যাননি। ‘বিচিত্র ছলনা জালে রাজনীতি’র মতো সত্য উন্মোচনকারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরেছেন। ড. আকবর আলি খান আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সুচিন্তিত মতামত, দূরদর্শী বই এবং মেধা ও সাহসের অমলিন ইতিহাস চিরকাল এই জাতিকে পথ দেখাবে।










