কিছু গান শুধু কানে শোনা যায় না, মনের গভীরে গিয়ে জায়গা করে নেয়। কোনো গান মনে করিয়ে দেয় প্রথম ভালোবাসার কথা, কোনোটি ফিরিয়ে আনে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের স্মৃতি, আবার কোনো গান নিঃশব্দে ছুঁয়ে যায় একাকিত্ব ও না-পাওয়ার বেদনা। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গান এমনই—সহজ, আবেগময় এবং বহু প্রজন্মের অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে মিশে থাকা।
১৯৯৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হন বাংলা গানের অন্যতম খ্যাতিমান গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। মৃত্যুর ২৭ বছর পরও তাঁর গান শ্রোতাদের কাছে সমান পরিচিত। পুরোনো দিনের প্রেম, বিরহ, অভিমান কিংবা জীবনের ছোট ছোট আনন্দকে তিনি এমন স্বাভাবিক ভাষায় গানে রূপ দিয়েছেন, যা সময়ের পরিবর্তনেও তার আবেদন হারায়নি।
তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় সৃষ্টিগুলোর একটি ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’। ১৯৬৬ সালের চলচ্চিত্র ‘শঙ্খবেলা’-য় লতা মঙ্গেশকর ও মান্না দের কণ্ঠে গানটি জনপ্রিয়তা পায়। গানটির কথায় প্রথম ভালোবাসার যে দ্বিধা, আকর্ষণ ও মায়া ফুটে উঠেছে, তা আজও শ্রোতাকে নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নেয়। একই চলচ্চিত্রে লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে ‘আজ মন চেয়েছে’ গানটিও বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
তবে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচয় কেবল কয়েকটি জনপ্রিয় প্রেমের গানের গীতিকার হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা গানের বিস্তৃত ভুবনে তিনি রেখে গেছেন বিপুল সৃষ্টিসম্ভার। তাঁর লেখায় প্রেমের পাশাপাশি উঠে এসেছে প্রকৃতি, জীবন, হাসি-কান্না, সামাজিক অনুভূতি, দেশ ও মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নানা রং।
শিল্প-সাহিত্যের আবহে বেড়ে ওঠা
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩১ সালের ২ মে হাওড়ার সালকিয়ায়। তাঁর শৈশব কেটেছে হাওড়াতেই। পরিবারে নাটক, সাহিত্য ও সংগীতের চর্চা থাকায় ছোটবেলা থেকেই শিল্পের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
শৈশবের সেই সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর সৃজনশীল মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়। মানুষের আবেগকে কাছ থেকে দেখার এবং তা সহজ ভাষায় প্রকাশ করার যে ক্ষমতা তাঁর লেখায় দেখা যায়, সেটিই পরবর্তীতে তাঁকে বাংলা গানের জগতে আলাদা করে পরিচিত করে তোলে।
বাংলা গানের স্বর্ণযুগের গুরুত্বপূর্ণ নাম
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে বাংলা চলচ্চিত্র ও আধুনিক গানের জগতে একের পর এক স্মরণীয় গান সৃষ্টি হচ্ছিল। সুরকার, গীতিকার ও শিল্পীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলা গান তখন জনপ্রিয়তার পাশাপাশি শিল্পমূল্যেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গীতিকার।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, গীতা দত্ত, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, হৈমন্তী শুক্লা, শ্যামল মিত্র, ভূপেন হাজারিকা, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, অরুন্ধতী হোমচৌধুরী, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, অনুপ ঘোষাল ও আরতী মুখোপাধ্যায়সহ বহু খ্যাতিমান শিল্পীর কণ্ঠে তাঁর লেখা গান শ্রোতাদের কাছে পৌঁছেছে।
তাঁর গানের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে চার হাজারের বেশি গান রচনার কথা বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। চলচ্চিত্রের গান ও আধুনিক বাংলা গানের পাশাপাশি তিনি শ্যামাসংগীত, ছড়া, গল্প, উপন্যাস এবং চিত্রনাট্যও লিখেছেন।
স্মৃতিতে বেঁচে থাকা অসংখ্য গান
১৯৬৬ সালের ‘শঙ্খবেলা’ চলচ্চিত্রের ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ তাঁর সৃষ্টির অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ। লতা মঙ্গেশকর ও মান্না দের কণ্ঠে গানটি প্রেমের অনুভূতিকে যে ভাষায় প্রকাশ করেছে, তা বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে আজও বিশেষ আবেদন তৈরি করে।
১৯৬৯ সালের ‘প্রথম কদম ফুল’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি লেখেন ‘আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না’। গানটির কথায় ছিল ভিন্ন ধরনের রসবোধ ও প্রাণবন্ততা। এ ছাড়া তাঁর লেখা ‘আমার বলার কিছু ছিল না’, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’, ‘ক ফোঁটা চোখের জল’, ‘তুমি নিজের মুখে বললে যেদিন’, ‘নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা’, ‘ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে’, ‘এক বৈশাখে দেখা হলো দুজনার’, ‘রঙ্গিলা বাঁশিতে কে ডাকে’ এবং ‘সে আমার ছোট বোন’-এর মতো গানও দীর্ঘদিন ধরে শ্রোতাদের স্মৃতিতে রয়েছে।
এই গানগুলোর বৈচিত্র্যই পুলকের লেখার পরিধি বোঝায়। কোথাও প্রেম, কোথাও বিষণ্নতা, কোথাও হাস্যরস—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি গানের কথাকে শ্রোতার অনুভূতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে পেরেছিলেন।
গানের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বহুমুখী সৃষ্টিশীল মানুষ। গান লেখার পাশাপাশি তিনি গল্প, ছড়া, উপন্যাস ও চিত্রনাট্য রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আমার প্রিয় গান’, ‘বাহাত্তুরে’, ‘শেষ সংলাপ’ এবং আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘কথায় কথায় রাত হয়ে যায়’।
১৯৯৬ সালে তাঁর লেখা আটটি আত্মজীবনীমূলক গান নিয়ে ‘আমি দেখেছি’ অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। এতে মান্না দে তাঁর গান পরিবেশন করেন। নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতার দিকে ফিরে তাকিয়ে গান লেখার এই প্রয়াস তাঁর সৃষ্টিশীলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।
বেদনাময় শেষ অধ্যায়
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্টিশীল জীবন ছিল সাফল্যে সমৃদ্ধ, কিন্তু জীবনের শেষ পর্ব ছিল বেদনাময়। শেষ জীবনে তিনি মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অন্তর্গত কষ্টের প্রকৃত কারণ নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায়নি।
১৯৯৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর হুগলি নদীতে একটি লঞ্চ থেকে ঝাঁপ দিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। আকস্মিক এই ঘটনায় বাংলা সংগীতাঙ্গনে গভীর শোক নেমে আসে। যিনি অসংখ্য মানুষের প্রেম, আনন্দ, অভিমান ও বিষণ্নতাকে গানের ভাষা দিয়েছিলেন, তাঁর নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়ই থেকে যায় নানা অজানা প্রশ্নে ঘেরা।
সৃষ্টির মধ্যেই তাঁর দীর্ঘ জীবন
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় চলে গেছেন বহু বছর আগে। কিন্তু তাঁর গান থেমে যায়নি। রেডিও, পুরোনো রেকর্ড, টেলিভিশন কিংবা বর্তমানের ডিজিটাল মাধ্যমে তাঁর গান যখনই ফিরে আসে, তখনই যেন ফিরে আসে অন্য এক সময়।
‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ শুনলে কারও মনে পড়ে যেতে পারে প্রথম প্রেমের কোনো বিকেল। ‘আমার বলার কিছু ছিল না’ হয়তো মনে করিয়ে দিতে পারে না-বলা কোনো কথা। আবার তাঁর অন্য কোনো গান ফিরিয়ে আনতে পারে হারিয়ে যাওয়া মানুষ কিংবা পুরোনো সম্পর্কের স্মৃতি।
এটাই একজন গীতিকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য—নিজের সময়কে অতিক্রম করে মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ হয়ে ওঠা। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই জায়গাটিই অর্জন করেছিলেন।
তাঁর লেখা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ একদিন চলে যায়, কিন্তু সত্যিকারের সৃষ্টি থেকে যায়। সময় বদলায়, শ্রোতার বয়স বদলায়, গানের মাধ্যম বদলায়—তবু কিছু অনুভূতি বদলায় না। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান সেই চিরচেনা অনুভূতিগুলোকেই শব্দ দিয়েছে।
জন্ম: ২ মে ১৯৩১
মৃত্যু: ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯
বাংলা গানের এই খ্যাতিমান গীতিকারের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।










