কিছু কবিতা কেবল পঙ্ক্তির সমষ্টি নয়, মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া সময় আর অপূর্ণ স্বপ্নের সঙ্গে মিশে গিয়ে সেগুলো জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ তেমনই একটি কবিতা। শৈশবের ছোট ছোট প্রত্যাশা থেকে শুরু করে বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন, প্রেমের প্রতিশ্রুতি এবং দীর্ঘ অপেক্ষার বেদনা—সব মিলিয়ে কবিতাটি যেন মানুষের জীবনে জমে থাকা না-পাওয়ার এক দীর্ঘ হিসাব।
৭ সেপ্টেম্বর কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিন। ১৯৩৪ সালের এই দিনে বর্তমান বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার আমগ্রাম গ্রামে জন্ম নেওয়া এই সাহিত্যিক পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক লেখকে পরিণত হন। ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর কলকাতায় ৭৮ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়। জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করলে বারবার ফিরে আসে তাঁর সেইসব লেখা, যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি খুব সহজেই পাঠকের নিজের জীবনের সঙ্গে মিশে যায়।
‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার শক্তি মূলত এখানেই। কবি নিজের জীবনের নানা স্মৃতি সামনে আনলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত আর কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থাকে না। শৈশবে পাওয়া প্রতিশ্রুতি, বড় হয়ে কিছু দেখার আকাঙ্ক্ষা, পরিবারের অভাবের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন এবং ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া আশ্বাস—সবকিছু একে একে ভেঙে যাওয়ার মধ্য দিয়ে কবিতাটি মানুষের চিরচেনা অপেক্ষার গল্প হয়ে ওঠে।
কবিতার শুরুতে রয়েছে শৈশবের স্মৃতি। একসময় যে মানুষটি নির্দিষ্ট দিনে ফিরে আসার কথা দিয়েছিল, সে আর ফেরেনি। মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলীও বড় হলে কবিকে একটি বিল দেখানোর কথা বলেছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতিও অপূর্ণ থেকে যায়। শিশুমনের কাছে বিষয়গুলো হয়তো খুব বড় ছিল না—একটি খেলনা, সামান্য কোনো মিষ্টি বা দূরের কোনো উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ছোট ছোট না-পাওয়াই স্মৃতির ভেতর বড় হয়ে ওঠে।
এরপর কবিতার আবেগ আরও গভীর হয় বাবাকে ঘিরে। বাবার কাঁধে হাত রেখে ভবিষ্যৎ নিয়ে দেওয়া আশ্বাসের মধ্যে ছিল অভাব পেরিয়ে ভালো থাকার স্বপ্ন। সন্তানের জন্য একজন বাবার যে প্রত্যাশা—একদিন পরিস্থিতি বদলাবে, সংসারে স্বচ্ছলতা আসবে, জীবনের কাঙ্ক্ষিত কিছু পাওয়া যাবে—সেই স্বপ্নই কবিতায় একসময় অসমাপ্ত থেকে যায়।
বাবা শেষ পর্যন্ত দৃষ্টিশক্তি হারান। অথচ যে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন তিনি সন্তানের জন্য দেখেছিলেন, সেই ভবিষ্যৎ তাঁর নিজের জীবনে পূর্ণতার আলো নিয়ে আসেনি। এই জায়গায় কবিতাটি শুধু একজন পিতার বেদনা নয়, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম ও অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
শৈশবের পর আসে প্রেম। বরুণাকে ঘিরে কবিতার অংশে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি, বিশ্বাস এবং তার জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে। কবি ভালোবাসার প্রমাণ দিতে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্কও প্রতিশ্রুতির জায়গায় স্থায়ী হয়ে ওঠেনি।
এই ধারাবাহিক অপূর্ণতাই কবিতার মূল সুর। শৈশবের মানুষ কথা রাখেনি, কৈশোরের স্বপ্ন পূরণ হয়নি, বাবার প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়নি, প্রেমও স্থায়ী হয়নি। একের পর এক প্রতিশ্রুতি ভেঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত কবিকে এমন এক উপলব্ধির সামনে দাঁড় করায়, যা পাঠকের কাছেও অস্বস্তিকরভাবে পরিচিত—জীবনে সবাই কথা রাখে না।
এই কারণেই ‘কেউ কথা রাখেনি’ শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের কবিতা নয়। এর আবেদন প্রজন্ম পেরিয়ে টিকে আছে। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই এমন কিছু প্রতিশ্রুতি থাকে, যেগুলো আর পূরণ হয় না। কেউ ফিরে আসার কথা বলে আর আসে না, কেউ একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে বলে আশ্বাস দেয়, আবার সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি আর আসে না। কেউ স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু সেই স্বপ্নের শেষটুকু দেখার সুযোগ হয় না।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক কৃতিত্বও এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে এমন সহজ ও পরিচিত ভাষায় প্রকাশ করেছেন, যাতে পাঠক নিজের জীবনকে তাঁর লেখার মধ্যে খুঁজে পান। তাঁর কবিতায় প্রেম আছে, আছে নিঃসঙ্গতা, নগরজীবনের টানাপোড়েন, যৌবনের আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, শরীর ও অস্তিত্বের নানা প্রশ্ন। একই সঙ্গে তাঁর গদ্যেও ছিল সময় ও সমাজকে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি।
সুনীল ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, ভ্রমণলেখক ও শিশুসাহিত্যিক। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ তাঁকে বহুমাত্রিক সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি ‘নীললোহিত’, ‘সনাতন পাঠক’ ও ‘নীল উপাধ্যায়’ নামেও লিখেছেন।
১৯৫৩ সালে কয়েকজন তরুণ কবির সঙ্গে তিনি ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে পত্রিকাটি বাংলা কবিতার নতুন প্রজন্মের লেখকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক পরিসর তৈরি করে। নতুন ভাষা, নতুন জীবনবোধ ও প্রচলিত কাঠামোর বাইরে কবিতাকে দেখার প্রবণতার সঙ্গে ‘কৃত্তিবাস’-এর নাম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
উপন্যাসেও সুনীলের সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ও ‘আত্মপ্রকাশ’-এর মতো রচনা বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁকে স্থায়ী জায়গা করে দেয়। কিশোর পাঠকদের কাছেও তিনি বিশেষভাবে জনপ্রিয় হন কাকাবাবু চরিত্রের মাধ্যমে। ইতিহাস, সমাজ, প্রেম, ভ্রমণ ও ব্যক্তিমানুষের অন্তর্গত জগত—বিভিন্ন বিষয় তাঁর লেখায় আলাদা মাত্রা পেয়েছে।
‘সেই সময়’ উপন্যাসের জন্য তিনি ১৯৮৫ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তবে পুরস্কার বা সাহিত্যিক পরিচয়ের বাইরেও সুনীলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পাঠকের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ। তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে অনেক পাঠকেরই মনে হয়েছে, লেখক যেন তাঁদের নিজেদের জীবনের কথাই লিখছেন।
তাঁর কবিতার জগতে ‘নীরা’ একটি স্মরণীয় নাম। প্রেম ও ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে এই চরিত্র ও নামটি দীর্ঘদিন ধরে সুনীলের কবিতার পাঠকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে এসেছে। তাঁর কবিতায় প্রেম কখনো উচ্ছ্বাস, কখনো আকাঙ্ক্ষা, কখনো বিচ্ছেদ, আবার কখনো স্মৃতির ভেতর ফিরে আসা এক অনুভূতি হিসেবে ধরা দিয়েছে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনাবসানের পরও তাঁর সাহিত্য পাঠকের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ তাঁর লেখার মানুষগুলো কেবল নির্দিষ্ট সময় বা সমাজের প্রতিনিধি নয়; তাদের অনুভূতিগুলো মানুষের চিরন্তন অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত।
‘কেউ কথা রাখেনি’ সেই সত্যটিই অন্যভাবে মনে করিয়ে দেয়। মানুষের জীবনে অনেক অপেক্ষা থাকে, অনেক অসমাপ্ত স্বপ্ন থাকে। কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়, কিছু প্রতিশ্রুতি স্মৃতিতে আটকে থাকে। আবার কিছু কথা এত বছর পরও মনে হয়, যেন সেদিনই বলা হয়েছিল।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় চলে গেছেন ২০১২ সালে। কিন্তু তাঁর সৃষ্ট চরিত্র, তাঁর কবিতার ভাষা এবং তাঁর লেখায় ধরা মানুষের না-পাওয়ার গল্প এখনো পাঠকের কাছে জীবন্ত। তাঁর জন্মদিনে তাই তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন সাহিত্যিককে স্মরণ করা নয়; একই সঙ্গে ফিরে দেখা আমাদের নিজেদের শৈশব, পরিবার, ভালোবাসা, অপেক্ষা ও অপূর্ণ স্বপ্নকে।
কেউ কথা রাখেনি—এই আক্ষেপের মধ্যেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার এক বড় শক্তি লুকিয়ে আছে। কারণ এই আক্ষেপ একা তাঁর নয়। জীবনের কোনো এক মোড়ে দাঁড়িয়ে প্রায় প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনো অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির সামনে এসে এই অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হয়।
সুনীলের সাহিত্য সেই পরিচিত বেদনারই ভাষা হয়ে রয়ে গেছে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
জন্ম: ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪
মৃত্যু: ২৩ অক্টোবর ২০১২










