হরমুজ প্রণালির একটি সুরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক মানববিহীন স্পিডবোট ড্রোনে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের নৌবাহিনী। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ভোরে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে মার্কিন সামরিক তৎপরতার ওপর তারা ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে।
আইআরজিরসি নৌবাহিনীর দাবি, মার্কিন সামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি একটি মানববিহীন জলযান বা ইউএসভি হরমুজ প্রণালির সুরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করছিল। তখন সেটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তবে হামলায় ড্রোনটি ধ্বংস হয়েছে কি না, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত এবং কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে—এসব বিষয়ে বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বিবৃতিতে ইরানের বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় শত্রুপক্ষের যেকোনো তৎপরতার জবাব দেওয়া হবে। আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে ইরানের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে এবং এই জলপথে বিদেশি সামরিক তৎপরতা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়। আইআরজিসির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে অঞ্চল থেকে সরে যাওয়া এবং সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। তবে এই হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মানববিহীন নৌযানের ব্যবহারও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। গত ২৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় চালকবিহীন স্পিডবোট ড্রোন মোতায়েন করেছিল। বিভিন্ন সামরিক মহড়ায় এ ধরনের মানববিহীন নৌযান ব্যবহারের নজির থাকলেও চলমান সংঘাতে এগুলোর ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এই ড্রোন স্পিডবোটগুলো মূলত দূর থেকে পরিচালিত বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচল করতে পারে। নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট ধরনের আক্রমণাত্মক কাজে এগুলো ব্যবহারের সক্ষমতাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছে বিস্ফোরক বহনকারী মানববিহীন নৌযান আত্মঘাতী হামলার মতো কৌশলেও ব্যবহার করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান এই ধরনের ড্রোন স্পিডবোট তৈরি করেছে বলে জানা যায়। প্রযুক্তিগতভাবে এসব নৌযানের বড় সুবিধা হলো, এগুলোতে কোনো চালকের জীবন ঝুঁকিতে না ফেলেই বিপজ্জনক সামুদ্রিক এলাকায় নজরদারি বা অভিযান পরিচালনা করা যায়।
এর আগে মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ নিয়েও আইআরজিসি ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দাবি দেখা গেছে। ইরানের দাবি, আইআরজিসি দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ—একটি বিমানবাহী রণতরী ও একটি ডেস্ট্রয়ার—লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। ইরানি বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় উভয় জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরে সেগুলো ওই এলাকা ছেড়ে যায়।
আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, ওই মার্কিন যুদ্ধজাহাজ দুটি ইরানি জাহাজকে অনুসরণ করছিল এবং সামুদ্রিক অবরোধে অংশ নিচ্ছিল। হামলার পর জাহাজগুলো সরে যাওয়ার কথাও তারা জানিয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড হামলার বিষয়টি স্বীকার করেছে বলেও দাবি করেছে ইরানি বাহিনী।
তবে এসব দাবির ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং ঘটনার পূর্ণ বিবরণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে তথ্য মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
হরমুজ প্রণালিতে সর্বশেষ এই ঘটনার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক উত্তেজনায় মানববিহীন প্রযুক্তির ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরাসরি যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি এখন চালকবিহীন নৌযানও নজরদারি ও সামরিক অভিযানের অংশ হয়ে উঠছে। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে এমন মুখোমুখি অবস্থান অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।










