যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি এক বছরের ব্যবধানে ৬১ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এই আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থানও সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এলএনজি আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ১৭তম অবস্থানে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ ৫০ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরবরাহ বেড়েছে ১৮ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ঘনফুট, যা প্রায় ৬১ শতাংশ বৃদ্ধির সমান।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের আমদানিনির্ভর গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের উৎসগুলোর ওপর নির্ভরশীল। কাতার ও ওমানসহ প্রধান সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এলএনজি আমদানি করে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে গ্যাসের চাহিদা মেটানো হয়। ফলে কোনো একটি অঞ্চলকে ঘিরে সরবরাহঝুঁকি তৈরি হলে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এই নৌপথে বিঘ্ন দেখা দিলে এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের পরিবহন ব্যয়, সরবরাহের সময়সূচি এবং বাজারদরে প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব অনুভূত হয়েছে। গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর প্রভাব সরাসরি শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় উৎস বৈচিত্র্য আনার প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কোনো একটি অঞ্চল বা কয়েকটি নির্দিষ্ট সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারলে আন্তর্জাতিক সংকটের সময় সরবরাহঝুঁকি কিছুটা সামাল দেওয়া সহজ হতে পারে।
তবে আমদানি বাড়লেই গ্যাস সংকট পুরোপুরি দূর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারদর, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং দেশের নিজস্ব অবকাঠামোগত সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমদানি করা এলএনজি গ্রহণ, পুনর্গ্যাসীকরণ এবং জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহের সক্ষমতাও সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বৃদ্ধির পরিসংখ্যান তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক পরিবর্তনের তথ্য নয়। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা এবং ভবিষ্যতে এলএনজি সংগ্রহের উৎস বৈচিত্র্য করার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার যখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, পরিবহনঝুঁকি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্য নির্ভরযোগ্য ও বহুমুখী এলএনজি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ৬১ শতাংশ বাড়ার ঘটনাটি সেই পরিবর্তনশীল বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।










