জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

শো’ন অ্যারেস্ট: আইনি প্রক্রিয়া নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার?

নিজস্ব প্রতিবেদক
তদন্তের স্বার্থে কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর নতুন মামলায় ‘শো’ন অ্যারেস্ট’ বা শ্যোন অ্যারেস্ট আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশ হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এর অপপ্রয়োগ নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠছে। এক মামলায় জামিন পাওয়ার পর কারাগার থেকে বের হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে অন্য মামলায় নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানোর এই সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি রয়েছেন বিশিষ্ট গণমাধ্যম উদ্যোক্তা ও মোহনা টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাহেদ আহমেদ মজুমদার। পরিবারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, একের পর এক মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় তাকে বারবার শো’ন অ্যারেস্ট দেখিয়ে জামিনের পরও মুক্তির স্বাভাবিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে একটি মামলায় কারাগারে বন্দি রয়েছেন সাহেদ আহমেদ। এর দীর্ঘ এই কালপরিক্রমায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন মামলায় অন্তত চারবার তার জামিন মঞ্জুর হয়েছে। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন লাভের পর প্রতিবারই কারা ফটক থেকে তাকে ফের নতুন কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৬ আগস্টও তাকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়, যা তার পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে।
পরিবারের ভাষ্যমতে, গত বছর রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে সাহেদ আহমেদকে আটক করে পুলিশের বিশেষায়িত ফোর্স কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। পরে তাকে গুলশান থানার একটি নির্দিষ্ট নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মূলত সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও একাধিক মামলায় তার বিরুদ্ধে আইনি হয়রানিমূলক প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। আর এ কারণেই মিরপুর মডেল ও গুলশান থানার পুরোনো বা অমীমাংসিত মামলায় তাকে একাধিকবার শো’ন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির সদস্যরা। তাঁদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনার পরও শো’ন অ্যারেস্টের ঘটনা থামেনি। সাহেদ আহমেদের স্ত্রী বুশরা সাবাহ এমদাদের একটি মানবিক আবেদনকে কেন্দ্র করে বিষয়টি নতুন করে জাতীয় গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। গত ১৬ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন-৩ শাখা থেকে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) সাহেদ আহমেদকে সংশ্লিষ্ট অপ্রাসঙ্গিক মামলা থেকে অব্যাহতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
তবে পরিবারের জোরালো অভিযোগ, ওই সরকারি নির্দেশনার প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও পুলিশ সাহেদ আহমেদকে নতুন মামলায় আবারও শো’ন অ্যারেস্ট দেখিয়েছে। এতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে পুলিশের ভূমিকা ঘিরে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের মতে, বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোয় সরকার যখন সার্বিক সুশাসন নিশ্চিতসহ একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে নিরলস কাজ করছে, তখন পুলিশের এই ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সরকারের মূল এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে এক বিরাট অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে।
একই ব্যক্তিকে একের পর এক মামলায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর কারণে আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও তিনি কারাগারের চার দেয়াল থেকে বের হতে পারছেন না। তাদের মতে, মূলত পুলিশি তদন্তের স্বার্থে শো’ন অ্যারেস্টের যে জনকল্যাণকর আইনি ব্যবস্থা রয়েছে, সেটিকেই এখন দীর্ঘমেয়াদি আটকে রাখার অস্ত্র বা হাতিয়ার হিসেবে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ সাহেদ আহমেদ মজুমদার একজন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও তাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আইনি এবং মানবাধিকার কাঠামোর দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও বিশিষ্ট আইনজীবীরা তীব্র সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট লালন হোসেন মনে করেন, জামিন পাওয়া যেকোনো নাগরিকের জন্মগত ও সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার। কিন্তু বারবার শো’ন অ্যারেস্ট দেখানোর মাধ্যমে সেই অধিকারকে পরিকল্পিতভাবে খর্ব করা হচ্ছে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কোনো আলোচিত মামলা বা দুর্ধর্ষ অপরাধীর ক্ষেত্রে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া হলেও, একজন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তির সাথে এমন আচরণ কেবল তার অধিকারই হরণ করে না, বরং দেশের সার্বিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্টের প্রবীণ আইনজীবী খন্দকার হাসান শাহরিয়ার আরও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, শো’ন অ্যারেস্ট নিঃসন্দেহে পুলিশের নির্বাহী ক্ষমতার গুরুতর অপব্যবহার। এর পেছনে অনেক সময় অদৃশ্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ বা প্রভাব জড়িত থাকে। পৃথিবীর কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে কোনো মানুষ অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে তাকে এভাবে অন্তহীন কারাবন্দি করে রাখা হয় না। অথচ আমাদের দেশে উচ্চ আদালত থেকে জামিন মেলার পরও শ্যোন অ্যারেস্টের প্যাঁচে ফেলে নাগরিকদের বন্দি করে রাখা হচ্ছে।
এই আইনজীবী আরও যোগ করেন যে, জামিনপ্রাপ্ত কোনো আসামির বিরুদ্ধে যদি অন্য কোনো মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকে, তবে সেই তথ্য তো সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আগেই জানার কথা এবং সেই অনুযায়ী যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা। কোনো আসামির জামিন হওয়ার পর হঠাৎ তদন্ত কর্মকর্তার এই হুঁশ হওয়াটা অত্যন্ত সন্দেহজনক। এজাহারে কারও সুনির্দিষ্ট নাম থাক বা না থাক কিংবা কেবল সন্দেহজনক আসামিকে শ্যোন অ্যারেস্টের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এভাবে যত্রতত্র গ্রেপ্তার দেখানো একেবারেই অনুচিত।
কোনো মামলায় জামিন লাভের পরে নতুন কোনো মামলায় শো’ন অ্যারেস্ট দেখাতে হলে ওই নতুন মামলার কোনো সাক্ষীর বা আসামির ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ বা ১৬১ ধারার স্টেটমেন্টে সুনির্দিষ্টভাবে ওই ব্যক্তির জড়িত থাকার প্রমাণ না মিললে শো’ন অ্যারেস্ট দেখানো আইনের সম্পূর্ণ অপব্যবহার। এটি করে ক্ষেত্রবিশেষে স্বার্থান্বেষী মহলের অন্যায় লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয় বলেও মনে করেন তিনি।
নাগরিক অধিকার ও সুশাসনের সার্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেকোনো ধরনের বেআইনি গ্রেপ্তার, হয়রানি বা যান্ত্রিক ‘শো’ন অ্যারেস্ট’-এর মতো অনভিপ্রেত চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। সাধারণ নাগরিকের ন্যায়বিচার, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং আইনের সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া বর্তমানে একান্তভাবে জরুরি।
পরিবারের দাবি ও ব্যক্তিগত পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাহেদ আহমেদ রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি নিজে কখনোই কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। বরং সাংস্কৃতিক, সৃজনশীল ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেই তার বেশি অনুরাগ ও সম্পৃক্ততা ছিল। গিটার বাজানো ও রংতুলিতে ক্যানভাস রাঙানোই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। যেসকল সংঘাতময় ঘটনার মামলায় তাকে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সেসব ঘটনার সঙ্গে তার ন্যূনতম কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না—এমনকি সংশ্লিষ্ট ঘটনার সময় তিনি ওই নির্দিষ্ট এলাকাতেও উপস্থিত ছিলেন না বলে জোরালো দাবি করেছে তার পরিবার।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে স্বামী কারাগারে বন্দি থাকায় নিজের দুই নিষ্পাপ শিশুকন্যাকে নিয়ে অত্যন্ত মানবেতর ও অসহায় জীবনযাপন করছেন বুশরা সাবাহ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তিনি একাই আইনি, সামাজিক ও প্রশাসনিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দ্রুত সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটন এবং সাহেদ আহমেদের প্রতি মানবিক ও আইনি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
সংবাদ প্রকাশের পূর্বে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানার জন্য গুলশান ও মিরপুর মডেল থানার সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য বা কথা বলতে রাজি হননি। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপ-কমিশনার মো. আকতার হোসেন এ বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ার সামনে সরাসরি কথা না বলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলের সাথে আলোচনার পরামর্শ দেন।
শো’ন অ্যারেস্টের আইনি ভিত্তি ও প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত সরকারের পতনের পর ড. মোহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট ‘কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট) অর্ডন্যান্স-২০২৫’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ওই অধ্যাদেশের ‘১৬৭ এ’ ধারায় প্রথম আইনগতভাবে ‘শো’ন অ্যারেস্ট’ বা শ্যোন অ্যারেস্ট পরিভাষাটি যুক্ত করা হয়। এর তিনটি উপধারায় শ্যোন অ্যারেস্টপ্রাপ্ত আসামির ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতার কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
পরবর্তী সময়ে দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর নবগঠিত সরকার সেই অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করে ‘কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট-২০২৬’ (২০২৬ সনের ১১ নম্বর আইন) প্রণয়ন করে। বর্তমান বলবৎ থাকা ওই আইনের ভেতর শ্যোন অ্যারেস্টের আইনি বিধান হিসেবে ‘১৬৭ এ’ ধারার অন্তর্ভুক্তি অব্যাহত রয়েছে।
এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫১ ধারায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো আমলযোগ্য অপরাধের বিচার বা অনুসন্ধানের সময় যদি সাক্ষ্য-প্রমাণে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আদালতে সশরীরে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট অপরাধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, তবে আদালত সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে ওই ব্যক্তিকে আটক করার বা গ্রেপ্তার দেখানোর বিশেষ ক্ষমতা রাখেন, যা আইনি পরিভাষায় শ্যোন অ্যারেস্ট হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে পুলিশ আইনগত এই পথ অনুসরণ না করে সাধারণত কোনো আসামির জামিন মঞ্জুর হলেই তার বিরুদ্ধে যান্ত্রিকভাবে এই শো’ন অ্যারেস্টের আবেদন করছে।
সব মিলিয়ে, বিশিষ্ট গণমাধ্যম উদ্যোক্তা সাহেদ আহমেদ মজুমদারের ক্ষেত্রে একের পর এক আইনি জামিন লাভের পরেও কারাফটক থেকে পুনরায় গ্রেপ্তারের এই পুনরাবৃত্তি দেশের বিচার অঙ্গনে শো’ন অ্যারেস্টের সঠিক প্রয়োগ এবং এর অপপ্রয়োগ নিয়ে নতুন করে গভীর আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর