জেলা প্রতিনিধি,
মায়ের শেষ বিদায়ে অংশ নেওয়ার আকুতি সবারই থাকে। কিন্তু সেই বিদায়লগ্নেও যদি হাতে বন্দিদশার লোহা ঝোলে, তবে তা কতটা হৃদয়বিদারক হতে পারে, তার বাস্তব চিত্র দেখা গেল জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে। দুই ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করেছেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম। তবে পুরোটা সময় জুড়েই তাঁর হাতে হাতকড়া পরানো ছিল, যা নিয়ে পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
ঘটনাটি ঘটে জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার মামুদপুর ইউনিয়নের চৌমুনী বাজার এলাকার ধনতলা গ্রামে। রাশেদুল ইসলাম ওই গ্রামের প্রয়াত শামসুদ্দীনের ছেলে। গত বছর সংঘটিত ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের করা একটি নাশকতার মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি গত ২২ আগস্ট থেকে কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার ভোরে আকস্মিক অসুস্থতাজনিত কারণে রাশেদুলের মা রহিমা বিবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর শোকে মুহ্যমান পরিবার দ্রুত তাঁর শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে প্রশাসনের কাছে প্যারোলে মুক্তির আবেদন জানায়। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে দুই ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। কঠোর পুলিশি পাহারায় তাঁকে সরাসরি নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। হাতকড়া পরা অবস্থায় তিনি কিছু সময় মায়ের শীতল মরদেহের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর একই পরিস্থিতিতে জানাজার নামাজে অংশ নেন এবং পরে কবরস্থানে দাফনকার্য সম্পন্ন করেন। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ তাঁকে পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
জয়পুরহাট কারাগারের জেলার তোফায়েল আহাম্মেদ খাঁন গণমাধ্যমকে জানান, আইনি প্রক্রিয়া মেনে মঙ্গলবার বেলা সোয়া দুইটার দিকে রাশেদুল ইসলামকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। এরপর প্যারোলের মেয়াদ শেষ হলে বিকেল সোয়া চারটার দিকে তাঁকে সুনির্দিষ্ট পাহারায় পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে জানাজার মতো একটি আবেগঘন ও সংবেদনশীল মুহূর্তে তাঁর হাতে হাতকড়া পরিয়ে রাখার বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষের নজরে ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্যমতে, বন্দি স্থানান্তরের সময় নিরাপত্তার বিষয়টি পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এখতিয়ারভুক্ত।
একজন বন্দির প্যারোল মুক্তির মানবিক সুযোগ পাওয়ার পরও জানাজার মতো পবিত্র অনুষ্ঠানে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় উপস্থিত থাকার এই দৃশ্য স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের ঘটনার সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার প্রটোকল ও আইনি বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছে। সব মিলিয়ে মায়ের জানাজায় অংশ নেওয়ার এই ঘটনাটি স্থানীয় রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বেশ আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।









