,

ছিনতাই আতঙ্কে ভোরের ঢাকা, বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

রাজধানী ঢাকায় দিনের শুরু হওয়ার আগের সময়টুকু যেন অনেক মানুষের জন্য বাড়তি ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত ফাঁকা সড়ক, সীমিত মানুষের উপস্থিতি এবং দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ছিনতাইকারীরা সক্রিয় হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় ছিনতাইয়ের সময় শুধু অর্থ বা মালামালই খোয়া যায়নি, প্রাণও হারিয়েছেন সাধারণ মানুষ।

গত ২৯ আগস্ট ভোর সাড়ে ৬টার দিকে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার সামনে এমনই এক ঘটনায় প্রাণ হারান বগুড়ার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন। রিকশায় করে হাসপাতালে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তাঁর হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেয়। হঠাৎ টানে চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের অন্য সময়ের তুলনায় ভোরের দিকে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বিশেষভাবে দেখা যায়। এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ।

২০২৬ সালের জুনে ঈদের ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার পর রিকশায় যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে পড়ে গুরুতর আহত হন এক নারী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এর আগে ২০২৩ সালের ১ জুলাই ভোর সোয়া ৪টার দিকে ফার্মগেটে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন পুলিশ কনস্টেবল মনিরুজ্জামান তালুকদার।

২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর ভোরে ঢাকার কেরানীগঞ্জে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন অটোরিকশাচালক মো. নয়ন। ছিনতাইকারীরা তাঁর ওপর হামলা চালিয়ে অটোরিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায়। একই সময়ে ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কর্মস্থলমুখী শ্রমিক ও পেশাজীবীদের ওপর হামলা ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে।

২০২৫ সালে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় এক পুলিশ সদস্যকে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। একই বছর মোহাম্মদপুরে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করার সময় স্থানীয়দের গণপিটুনিতে হানিফ নামে একজন নিহত হন।

কেন ভোরের সময় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ

পুলিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মধ্যরাতের পর থেকে সকাল পর্যন্ত রাজধানীর অনেক সড়ক তুলনামূলক ফাঁকা থাকে। ২০২৩ সালে পুলিশ কনস্টেবল মনিরুজ্জামান হত্যার পরও পুলিশ জানিয়েছিল, রাত ২টার পর সড়কে মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় অপরাধীরা রাতের শেষ ভাগকে বেছে নেয়।

ভোরে পরিবহনকেন্দ্রগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চ থেকে নামা যাত্রীরা অনেক সময় নির্দিষ্ট পথ ধরে রিকশা বা অন্য যানবাহনে গন্তব্যে যান। ফলে তাঁদের চলাচলের ধরন আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব হয়। ছিনতাইকারীরা এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

এ সময় অধিকাংশ দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। পথচারীর সংখ্যাও তুলনামূলক কম। ফলে কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তায় এগিয়ে আসার মতো মানুষ পাওয়া কঠিন হতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোটরসাইকেলে দ্রুত এসে ব্যাগ বা মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার কৌশল।

বিশেষ করে চলন্ত রিকশা থেকে ব্যাগ টেনে নেওয়ার ঘটনা ঝুঁকিপূর্ণ। এতে ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তি শুধু মালামাল হারানোর আশঙ্কায় থাকেন না, চলন্ত যান থেকে পড়ে গুরুতর আহত হওয়ারও ঝুঁকি থাকে।

রাজধানীর কোন এলাকাগুলো ঝুঁকিতে

ঢাকায় ছিনতাইয়ের ঝুঁকি কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পুলিশের বিভিন্ন সময়ের তথ্য ও পর্যবেক্ষণে রাজধানীর একাধিক সড়ক, বাজার, পরিবহনকেন্দ্র ও সংযোগস্থল ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে।

ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, মগবাজার, মালিবাগ রেলগেট, কাকরাইল, মতিঝিল, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, কমলাপুর, বাবুবাজার, রাজারবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, জুরাইন রেলগেট, মিরপুর-১ থেকে টেকনিক্যাল মোড়, মিরপুর-৬-এর শিয়ালবাড়ী মোড়, কালশী, বাড্ডা, ভাটারা, বসিলা, জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের সড়ক, হাতিরঝিল ও বিমানবন্দর-সংলগ্ন সড়ক বিভিন্ন সময়ে পুলিশের নজরে এসেছে।

তবে এসব স্থানকে একসঙ্গে ভোররাতের ছিনতাইয়ের কেন্দ্র বলা ঠিক হবে না। সামগ্রিক ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বিবেচনায় এসব জায়গা চিহ্নিত হলেও ভোরের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পায় এমন স্থানগুলো, যেখানে পরিবহন থেকে যাত্রী নামেন, কর্মজীবী মানুষ চলাচল করেন, রাস্তা তুলনামূলক ফাঁকা থাকে এবং অপরাধের পর দ্রুত সরে যাওয়ার সুযোগ থাকে।

এই বিবেচনায় ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, মতিঝিল, ওয়ারী, মিরপুর, বাড্ডা ও ভাটারার মতো এলাকাগুলো ভোরের সময় বাড়তি নজরদারির প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।

পুলিশের একটি তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে তেজগাঁও বিভাগে ৫১টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। মতিঝিলে ৩২টি, মিরপুরে ২৭টি, রমনায় ২৫টি এবং গুলশানে ২১টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত হওয়ার কথাও উঠে এসেছে। এতে বোঝা যায়, ছিনতাইয়ের ঝুঁকি শুধু নির্জন সড়কে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের পথ, বাজার, আবাসিক এলাকা ও পরিবহনকেন্দ্রও এর আওতায় রয়েছে।

দুই বছরে ৭০৩ মামলা, গ্রেপ্তার ১,৮৩৭

ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজধানীতে ছিনতাই-সংক্রান্ত ৫৩১টি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ৪৩৫ জনকে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মামলা হয়েছে ১৭২টি এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪০২ জন।

অর্থাৎ, দুই বছর মিলিয়ে এ সময়ে ছিনতাই-সংক্রান্ত ৭০৩টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ জনকে।

বিভাগভিত্তিক হিসাবেও ছিনতাইয়ের চাপের পার্থক্য দেখা যায়। ২০২৫ সালে তেজগাঁও বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৪৬টি মামলা হয়েছে এবং ৫১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওয়ারী বিভাগে মামলা হয়েছে ৯৩টি, গ্রেপ্তার ২১৭ জন। মতিঝিল বিভাগে ১০১টি মামলায় ১৪৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

অন্যদিকে মিরপুর বিভাগে ৫৫টি মামলায় ২১৯ জন, রমনা বিভাগে ৪১টি মামলায় ১৪৪ জন, উত্তরা বিভাগে ৪১টি মামলায় ৭৫ জন, লালবাগ বিভাগে ২৭টি মামলায় ৫৩ জন এবং গুলশান বিভাগে ২৭টি মামলায় ৭৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

২০২৬ সালের তথ্যেও বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ওয়ারী বিভাগে ৩৮টি, তেজগাঁওয়ে ৩৪টি এবং মতিঝিলে ২৫টি মামলা হয়েছে। রমনায় ১৭টি, উত্তরা ১৭টি, মিরপুর ১৬টি, গুলশান ২০টি এবং লালবাগে ৫টি মামলা হয়েছে।

ভোর থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত বিশেষ নজরদারি

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর ছিনতাই ঠেকাতে রাজধানীতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। বিশেষ করে মধ্যরাত থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত সময়কে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট ও মোবাইল টহল জোরদার করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও পরিচালন) মোহাম্মদ ওসমান গনি জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরে মধ্যরাত থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত ছিনতাই প্রতিরোধে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ৮৯টি চেকপোস্ট বসিয়ে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। প্রতিটি চেকপোস্টে একজন কর্মকর্তা ও আটজন সদস্য মোতায়েন থাকছেন।

একই সময়ে প্রতিটি থানা থেকে চার থেকে পাঁচটি মোবাইল টহল দল দায়িত্ব পালন করছে। প্রতিটি দলে একজন কর্মকর্তা ও সাতজন সদস্য থাকছেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এগুলো স্বাভাবিক দায়িত্বের বাইরে ছিনতাই প্রতিরোধে নেওয়া বিশেষ ব্যবস্থা।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৮৯টি চেকপোস্ট এবং থানাভিত্তিক মোবাইল টহল দল মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ১১২ থেকে ২ হাজার ৪৬২ জন সদস্য মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত মাঠে থাকছেন। এর পাশাপাশি নিয়মিত টহল, পিকেট, ফুড পেট্রোলসহ অন্যান্য দায়িত্বে থাকা সদস্যরাও কাজ করছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানিয়েছেন, রাজধানীতে দিন-রাত বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চালু থাকে। চেকপোস্টের পাশাপাশি ফুড পেট্রোল, মোবাইল দল ও পিকেট দল বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করে। মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট উপ-পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ও সহকারী পুলিশ কমিশনাররা নিয়মিত তদারক করেন।

ছিনতাইয়ের ঘটনায় অভিযোগ পাওয়া গেলে মামলা নেওয়া এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রাজধানীর ভোরের সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের এই বাড়তি তৎপরতা কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে নিয়মিত নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আইনগত ব্যবস্থার ওপর। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে, দিনের শুরু হওয়ার আগের কয়েক ঘণ্টা ঢাকার পথচারী ও কর্মস্থলমুখী মানুষের জন্য বিশেষ সতর্কতার সময়।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | সাব-এডিটর । জিলাইভ বাংলা

https://glive24.com/

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।