ভয়ভীতি ও অপরাধের অন্ধকার পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রত্যয় নিয়ে অস্ত্র সমর্পণ করেছেন সুন্দরবনের চার সক্রিয় দস্যু বাহিনীর মোট ৫২ জন সদস্য। সোমবার র্যাব-৬-এর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন তারা। এর ফলে দক্ষিণবঙ্গের ত্রাসখ্যাত সুন্দরবনের জলদস্যু দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের আরও একটি বড় সাফল্য অর্জিত হলো।
দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের ওপর জীবিকার জন্য নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালরা জলদস্যুদের নির্মম অপহরণ ও চওড়া মুক্তিপণ দাবির সংস্কৃতিতে চরম ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গোয়েন্দা নজরদারি ও কঠোর অভিযানের পাশাপাশি সঠিক পন্থায় তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ায় এই সদস্যরা আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেন। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সদস্য রয়েছে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর, যাদের ১৬ জন আজ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ বেছে নিয়েছেন। এছাড়া আনারুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন এবং আফতাব বাহিনীর ৮ জন সদস্যও এই প্রক্রিয়ায় অস্ত্র জমা দিয়েছেন।
র্যাব-৬-এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে গত তিন মাস সুন্দরবনে সাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। সেই নিষেধাজ্ঞার নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে বনটি পর্যটক ও বনজীবীদের চলাচলের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা হচ্ছে। ঠিক এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের প্রাক্কালে বিপুলসংখ্যক জলদস্যুর অস্ত্র সমর্পণের ঘোষণা সুন্দরবনের সামগ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জলদস্যুদের এই আত্মসমর্পণের ফলে সুন্দরবনকেন্দ্রিক জীবিকা নির্বাহকারী সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়া নির্বিঘ্নে বনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। পর্যটন খাতের এই সুফল বনকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনীতিতেও সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
র্যাব কর্মকর্তা নিস্তার আহমেদ আরও স্পষ্ট করেছেন যে, আত্মসমর্পণকারী এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং আইনানুগ আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাদের যথাসময়ে আদালতে সোপর্দ করা হবে। সুন্দরবনের অনন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বননির্ভর সাধারণ জনগোষ্ঠীর জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ চিরতরে নির্মূল করতে র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ আভিযানিক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অবিরামভাবে অব্যাহত থাকবে।
আত্মসমর্পণকারী বাহিনীগুলোর সদস্য সংখ্যা ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্য নিচে ছকে তুলে ধরা হলো:
| বাহিনীর নাম | আত্মসমর্পণকারী সদস্য সংখ্যা | বর্তমান আইনি অবস্থা | পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া |
| বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী | ১৬ জন | র্যাবের জিম্মায় সোপর্দ | প্রচলিত আইনে বিচার ও পুনর্বাসন |
| আনারুল বাহিনী | ১৩ জন | র্যাবের জিম্মায় সোপর্দ | প্রচলিত আইনে বিচার ও পুনর্বাসন |
| আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনী | ১৫ জন | র্যাবের জিম্মায় সোপর্দ | প্রচলিত আইনে বিচার ও পুনর্বাসন |
| আফতাব বাহিনী | ৮ জন | র্যাবের জিম্মায় সোপর্দ | প্রচলিত আইনে বিচার ও পুনর্বাসন |
| মোট আত্মসমর্পণকারী | ৫২ জন | প্রক্রিয়াধীন | আদালতের মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ |
| অভিযانকারী সংস্থা | র্যাব-৬ | গোয়েন্দা নজরদারিতে সক্রিয় | আইন প্রয়োগকারী ভূমিকা |
| সুন্দরবন উন্মুক্তকরণ | ১ সেপ্টেম্বর | পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ শুরু | নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ |
| প্রধান লক্ষ্য | জলদস্যুমুক্ত সুন্দরবন | বনজীবীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি | স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল করা |
| জীববৈচিত্র্য রক্ষা | প্রজনন মৌসুম শেষ | পর্যটন খাত সচল | পরিবেশ সংরক্ষণ |
| আইনি প্রক্রিয়া | আদালতে সোপর্দ | প্রচলিত আইন অনুসরণ | স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা |








