বাংলাদেশের কাছে ঘরের মাঠে এক ম্যাচের পরাজয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট পরিকল্পনায় নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার দৌড়েও ওই হারের প্রভাব পড়েছে। ফলে সামনে থাকা প্রতিটি আন্তর্জাতিক সিরিজকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে অস্ট্রেলিয়া। জিম্বাবুয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের জন্য ঘোষিত ১৭ সদস্যের ওয়ানডে দলেও সেই ভাবনার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে।
মঙ্গলবার ঘোষিত দলে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি একঝাঁক তরুণকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ ও ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচির কথা মাথায় রেখে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারকে দলে ফেরানো হয়েছে, আবার পেসারদের কাজের চাপ কমাতে নেওয়া হয়েছে আলাদা ব্যবস্থাও। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ ওয়ানডে বিশ্বকাপের জন্য নতুন ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে চেয়েছেন নির্বাচকেরা।
দল ঘোষণার সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি মার্নাস লাবুশেনকে বাদ দেওয়া। বাংলাদেশ সিরিজে ব্যাট হাতে প্রত্যাশিত অবদান রাখতে পারেননি তিনি। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপজয়ী অস্ট্রেলিয়া দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কারণে জিম্বাবুয়ে ও দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ানডে দলে জায়গা হয়নি তার। টেস্ট দলেও তার অবস্থান এখন আগের মতো নিশ্চিত নয়।
লাবুশেনের জন্য সামনে ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে ছন্দ খুঁজে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ভারত সফর ও পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজ সামনে থাকায় নির্বাচকদের আস্থা ফেরাতে ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতা দেখানো তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ভবিষ্যতের জন্য তিন তরুণ ক্রিকেটারকে দলে নিয়েছে। ১৯ বছর বয়সী ব্যাটার অলি পিকের সঙ্গে আছেন দুই অলরাউন্ডার জো ডেভিস ও কুপার কনোলি। ডেভিসের বয়স ২২ এবং কনোলির ২৩। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত হওয়ার আগে তাদের জন্য এই সফর নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের বড় সুযোগ। আগামী বছরের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তরুণদের এখন থেকেই প্রস্তুত করার কৌশলও এতে স্পষ্ট হচ্ছে।
অভিজ্ঞতার দিক থেকে দলটি আরও শক্তিশালী হয়েছে মিচেল মার্শ, ট্রাভিস হেড ও জশ হ্যাজলউডের প্রত্যাবর্তনে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সফরের ওয়ানডে সিরিজে তারা ছিলেন না। এবার তিনজনই দলে ফেরায় ব্যাটিং, পেস বোলিং এবং মাঠের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়ার শক্তি বাড়বে।
পেস আক্রমণে অবশ্য পুরো দলকে একসঙ্গে ব্যবহার করা হবে না। অধিনায়ক প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ককে জিম্বাবুয়ে সিরিজে বিশ্রাম দিয়ে শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের জন্য রাখা হয়েছে। দীর্ঘ ক্রিকেট মৌসুমে টানা ম্যাচ খেলার চাপ কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের আগে তাদের সতেজ রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য। এতে জিম্বাবুয়ে সিরিজে অন্য পেসারদের নিজেদের যোগ্যতা দেখানোর সুযোগও তৈরি হবে।
দলে রয়েছেন স্পেন্সার জনসন, নাথান এলিস, জেভিয়ার বার্টলেট ও বিলি স্ট্যানলেকের মতো পেসার। বিশেষজ্ঞ স্পিনার হিসেবে আছেন অ্যাডাম জাম্পা। অন্যদিকে ম্যাথু কুনেমান ওয়ানডে দলে জায়গা পাননি। ফলে প্রতিপক্ষ, উইকেট ও ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী পেসনির্ভর আক্রমণ সাজানোর যথেষ্ট বিকল্প অস্ট্রেলিয়ার হাতে থাকছে।
অস্ট্রেলিয়ার সামনে রয়েছে ধারাবাহিক ব্যস্ততা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তারা তিনটি ওয়ানডে খেলবে। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হবে আরও তিনটি ওয়ানডে। ওয়ানডে সিরিজ শেষ হওয়ার পর অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে নামবে অস্ট্রেলিয়া। ডারবান, গেবেখা ও কেপটাউনে হবে তিনটি টেস্ট। টেস্টের জন্য আলাদা দল পরে ঘোষণা করা হবে।
এর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলের ভারত সফরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মাসের শেষ দিকে ভারত ‘এ’ দলের বিপক্ষে দুটি চার দিনের ম্যাচ ও তিনটি ওয়ানডে খেলবে তারা। মূল জাতীয় দলে জায়গার বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের জন্য এই সফর নিজেদের প্রস্তুতি ও পারফরম্যান্স দেখানোর গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
লাবুশেনের টেস্ট দলে জায়গা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় পিটার হ্যান্ডসকম্ব ও নাথান ম্যাকসুইনির মতো ব্যাটারদের জন্যও সুযোগ তৈরি হয়েছে। ‘এ’ দলের হয়ে ধারাবাহিক রান করে তারা নির্বাচকদের নজরে আসতে পারেন। একইভাবে ব্রেন্ডন ডগেট ও জাই রিচার্ডসনের মতো দ্রুতগতির বোলারদের পারফরম্যান্সও ভবিষ্যতের দল নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার নতুন ওয়ানডে দল নির্বাচন শুধু সামনের দুই সিরিজের পরিকল্পনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে অভিজ্ঞদের ফিরিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে দলের শক্তি বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে তরুণদের সুযোগ দিয়ে ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের কাছে পাওয়া ধাক্কার পর অস্ট্রেলিয়া যে নিজেদের পরিকল্পনা নতুন করে সাজাচ্ছে, এই দল নির্বাচন তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।









