জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

নেপালের বন্যায় নিখোঁজ দুই শতাধিক স্কুলশিক্ষার্থী

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রবল স্রোত, পানির তোড় ও ভূমিধসে বহু এলাকা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাবে দুই শতাধিক স্কুলশিক্ষার্থীর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। একই সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তিন জেলায় অন্তত ১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ১৯টি স্কুলের মধ্যে ৯টি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। আরও ৭টি স্কুল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিরূপণের কাজ চলছে। দুর্গত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরও এখনো অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যার প্রবল স্রোতে প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থী ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর নিখোঁজ থাকার তথ্যটি বৃহত্তর পরিসরের অনুসন্ধান পরিস্থিতিকে বোঝায়। ধ্বংসস্তূপ, কাদামাটি, ভেঙে পড়া স্থাপনা এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থার কারণে নিখোঁজদের সন্ধান করা উদ্ধারকারী দলের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলা। এই দুই জেলার কয়েকটি স্কুল পানিতে তলিয়ে গেছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান ভূমিধসের মাটির নিচে চাপা পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলগুলোতে মোট ২ হাজার ৪২৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত। ফলে প্রাণহানির আশঙ্কার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা কার্যক্রম নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

একটি স্কুল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পানির তীব্র স্রোতে শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি বাসও ভেসে গেছে। এ ঘটনায় দুর্গত এলাকায় শিশুদের চলাচল ও পরিবহনব্যবস্থার ঝুঁকি কতটা বেড়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে। অনেক পরিবার এখনো তাদের সন্তানদের নিরাপদ অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি।

দুর্যোগের মাত্রা নিরূপণে উপগ্রহচিত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় পানির বিস্তার, ধসে পড়া স্থাপনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে এসব চিত্র সহায়ক হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় উদ্ধারকারী দল সরাসরি পৌঁছাতে পারছে না, সেখানে আকাশপথের তথ্য অনুসন্ধান ও ত্রাণ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষাক্ষেত্রের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি নেপালের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যার পর ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ৯০০ জনের বেশি মানুষ আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে বিশেষায়িত সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী এবং প্রকৌশলগত সহায়তা প্রয়োজন হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, নেপালে বন্যা ও সংশ্লিষ্ট দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯১৯ জনে পৌঁছেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২৪৭ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক। সীমান্তের তিব্বত অংশেও পরিস্থিতি গুরুতর। সেখানে আরও ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

উদ্ধারকাজে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নেপাল শুরুতে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছিল। কিন্তু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের গভীর টানেল ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে শেষ পর্যন্ত ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।

এই দুর্যোগে তাৎক্ষণিকভাবে নিখোঁজ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অন্যান্য মানুষের সন্ধান করাই সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আহত ও বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। ধ্বংস হওয়া স্কুলগুলো দ্রুত পুনর্গঠন করা না গেলে হাজারো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হতে পারে।

নেপালের জন্য সংকটটি তাই শুধু উদ্ধার অভিযানেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা কমিয়ে আনা, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধার, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশে ফিরিয়ে নেওয়া এবং বন্যাকবলিত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন—সবকিছুই এখন সমান্তরালে সামলাতে হচ্ছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগের ক্ষত কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কার্যক্রম প্রয়োজন হবে।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক । জিলাইভ বাংলা

https://bn.glive24.com/

সর্বশেষ খবর