জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

রাজশাহীতে কৃষকদের জন্য ১০৪৫ টন টিএসপি বরাদ্দ

আমন ধানের ভরা মৌসুমে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকেরা। চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ কম থাকায় অনেক কৃষককে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অল্প পরিমাণ সার নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। একই সঙ্গে খুচরা বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।

রোববার সকালে পবা উপজেলার দারুসা বাজারে সার কিনতে যান কৃষক সাজ্জাদ। তাঁর প্রয়োজন ছিল ২০ কেজি সার। প্রায় দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি পেয়েছেন মাত্র পাঁচ কেজি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সার সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে কৃষিকাজের সময় নষ্ট হচ্ছে। তার ওপর প্রয়োজনের চার ভাগের এক ভাগ সারও পাওয়া যাচ্ছে না।

দারুসা বাজারে বিএডিসির সার ডিলার জীবন কুমারের দোকানের সামনে সেদিন শতাধিক কৃষককে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কৃষকদের অভিযোগ, ডিএপি ও টিএসপি সার সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা দোকানে গেলে নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ দাবি করা হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে ডিলারের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।

কৃষক হজরত আলী বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ায় তারা সমস্যায় পড়েছেন। আরেক কৃষক শামসুর রহমানের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের একটি অংশের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে এবং এর চাপ গিয়ে পড়ছে কৃষকদের ওপর।

নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ

কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাজারে বিভিন্ন ধরনের সারের দামে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত দামের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

বর্তমানে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের নির্ধারিত দাম এক হাজার ৩৫০ টাকা। কিন্তু খুচরা বাজারে কৃষকদের কাছ থেকে তা প্রায় দুই হাজার ৬০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে এক হাজার টাকার এমওপি সার কিনতে হচ্ছে প্রায় এক হাজার ৩০০ টাকায়। এক হাজার ৩৫০ টাকা দামের টিএসপি সারের জন্য কোথাও কোথাও তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। আর এক হাজার ৫০ টাকা নির্ধারিত দামের ডিএপি সার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত।

ফসলের ক্ষতি ঠেকাতে সময়মতো সার প্রয়োগ জরুরি হওয়ায় কৃষকেরা অনেক ক্ষেত্রে বেশি দাম দিয়েই সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

দারুসা বাজারের সার ডিলার জীবন কুমার অবশ্য বরাদ্দ কম পাওয়ার বিষয়টিকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হচ্ছে না। তিনি ২০ টন বরাদ্দ পেলেও ডিএপি পেয়েছেন মাত্র ৬৬ বস্তা, যা বিতরণ করে শেষ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি সরকারি বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

চার লাখের বেশি কৃষকের জন্য টিএসপি মাত্র ১,০৪৫ টন

রাজশাহী জেলায় কৃষকের সংখ্যা চার লাখ ১২ হাজারের মতো। তাঁদের জন্য সেপ্টেম্বর মাসে টিএসপি সার বরাদ্দ হয়েছে এক হাজার ৪৫ টন। এই পরিমাণ সার সব কৃষকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হলে প্রত্যেকের ভাগে পড়বে আনুমানিক আড়াই কেজি।

এমনকি এক বস্তা করে টিএসপি দেওয়ার হিসাব ধরলেও এই বরাদ্দে মাত্র ২০ হাজার ৯০০ কৃষককে সার দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে জেলার বিপুলসংখ্যক কৃষকের তুলনায় বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

একই হিসাবে প্রত্যেক কৃষকের জন্য এমওপি প্রায় চার কেজি এবং ডিএপি প্রায় সাত কেজি করে পড়বে। কৃষক ও সার ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, আমন মৌসুমের বাস্তব চাহিদা বিবেচনা না করে বরাদ্দ নির্ধারণ করায় ডিলার পর্যায়ে চাপ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ সার ব্যবসায়ী সমিতির রাজশাহী জেলা ইউনিট রোববার নগরীর রেলগেট এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করে সার বরাদ্দ পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনের জেলা সভাপতি মো. ওসমান আলী লিখিত বক্তব্যে বলেন, সরকারি গুদামে সার মজুত নিয়ে আতঙ্কের কারণ নেই। বাফার ও বিএডিসির গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। তবে কৃষকের চাহিদার সঙ্গে সরকারি বরাদ্দের সামঞ্জস্য না থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে।

রাজশাহীতে সারের বরাদ্দ ও বিতরণ ব্যবস্থা

জেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর। সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বিভিন্ন ধরনের সারের যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তার চিত্র হলো—

  • টিএসপি: ১,০৪৫ টন
  • এমওপি: ১,৬২৯ টন
  • ডিএপি: ৩,০১৫ টন
  • বিসিআইসির ডিলার: ৮৬ জন
  • বিএডিসির ডিলার: ১৩০ জন
  • মোট সার ডিলার: ২১৬ জন
  • কার্ডধারী খুচরা বিক্রেতা: ৪৭৫ জন
  • মাছ চাষের পুকুর: প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর

সংগঠনটির পক্ষ থেকে কৃষকের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ বাড়ানো, সংকটপূর্ণ এলাকায় দ্রুত অতিরিক্ত বরাদ্দ পাঠানো এবং মাছ চাষের পুকুরের জন্য আলাদা সার বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ডিলারদের কমিশন পুনর্নির্ধারণ এবং কৃষকদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সার ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

আলু-পেঁয়াজের জন্য আগাম সার কেনার অভিযোগ

সার ডিলারদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু আমন মৌসুমের চাহিদা দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। তাঁদের অভিযোগ, কিছু কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় আগেই বেশি সার কিনে রাখছেন। বিশেষ করে নভেম্বরের আলু ও পেঁয়াজ চাষ সামনে রেখে অনেকে এখন থেকেই সার সংগ্রহ করছেন। এতে বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

ডিলারদের আরও দাবি, কৃষকদের একটি অংশ কৃষি কর্মকর্তাদের সুপারিশ করা মাত্রার চেয়ে বেশি সার ব্যবহার করছেন। এতে সারের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জমির উর্বরতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই কোন ফসলে কী পরিমাণ সার প্রয়োজন, সে বিষয়ে কৃষকদের মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকর পরামর্শ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

রাজশাহীতে মাছ চাষের জন্য ব্যবহৃত পুকুরের পরিমাণও কম নয়। প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর পুকুরে মাছ চাষ হয় বলে সার ব্যবসায়ীদের সংগঠনের তথ্য। তাঁদের বক্তব্য, এসব জলাশয়ের জন্য কৃষি জমির বাইরে আলাদা সার বরাদ্দ থাকলে কৃষিকাজের জন্য নির্ধারিত সার সরবরাহের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।

কৃষি বিভাগের বক্তব্য, সরবরাহে সংকট নেই

তবে কৃষকদের অভিযোগের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয় জেলা কৃষি বিভাগ। রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন জানিয়েছেন, জেলার সব কৃষক আমন চাষ করেন না। ফলে মোট কৃষকের সংখ্যা দিয়ে আমন মৌসুমের সারের প্রকৃত চাহিদা নির্ধারণ করা ঠিক হবে না।

তিনি জানান, গতবারের তুলনায় এবার রাজশাহীতে বেশি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন আরও বেশি হলে নতুন করে চাহিদা পাঠানো হবে। ইতোমধ্যে অতিরিক্ত চাহিদাও পাঠানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তার মতে, আমন ধানের এ পর্যায়ে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন বেশি। টিএসপি ও ডিএপি এখন তুলনামূলক কম প্রয়োজন। তাঁর ধারণা, অনেক কৃষক পরবর্তী সময়ে আলু ও পেঁয়াজ চাষের জন্য আগাম সার সংগ্রহ করায় বাজারে সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

রাজশাহীর বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে কৃষকদের দ্রুত প্রয়োজনীয় সার পাওয়ার দাবি, অন্যদিকে সরকারি বরাদ্দ ও প্রকৃত চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্ন সামনে এসেছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত দামে সার বিক্রি হচ্ছে কি না, খুচরা পর্যায়ে মজুত বা অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নজরদারির আওতায় আনার দাবি উঠেছে। আমন মৌসুমে সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় কৃষকের চাহিদা, সরকারি মজুত ও বাজার ব্যবস্থাপনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | সাব-এডিটর । জিলাইভ বাংলা

https://glive24.com/

সর্বশেষ খবর