দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৫১৬ শিশুর শরীরে নিশ্চিত হাম অথবা হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৯৬৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দিনে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে চার শিশু। এর ফলে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬৮। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৯ শিশুর। দুই হিসাব একত্র করলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৬৭।
মৃত্যুর পাশাপাশি নতুন রোগী শনাক্তের সংখ্যাও উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৬৫ শিশুর শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১৫১ জন। অর্থাৎ এক দিনেই নিশ্চিত হাম ও উপসর্গ মিলিয়ে নতুন রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৫১৬।
হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যাও প্রতিদিন বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৯০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ১ হাজার ২৮ শিশু হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। ফলে একদিকে যেমন বিপুলসংখ্যক শিশুকে চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে আসায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপও তৈরি হচ্ছে।
আক্রান্ত ও চিকিৎসার সামগ্রিক চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৫ মার্চ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮২৯। এ সময়ে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ২১৮ শিশুর শরীরে।
একই সময়ের মধ্যে হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৪৭ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ৩২ হাজার ২৯২ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা নিশ্চিত আক্রান্তের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে উপসর্গ দেখা দেওয়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসার আওতায় আনা রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। শিশুদের মধ্যে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া হামের সাধারণ লক্ষণ। তবে সব ক্ষেত্রে উপসর্গ একই রকম নাও হতে পারে।
বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি জটিল আকার ধারণ করলে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই শিশুর জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি, কাশি বা চোখ লাল হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
টিকাদান ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব
হাম প্রতিরোধে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর নিয়মিত টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনো শিশু আক্রান্ত হলে তাকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব আলাদা রাখা জরুরি। এতে পরিবারের অন্য সদস্য ও আশপাশের শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা বাড়ালেই হবে না; আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানো, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং টিকাদানের আওতা জোরদার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গত কয়েক মাসের হিসাব বলছে, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক শিশু চিকিৎসার আওতায় এসেছে। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে এক লাখের বেশি রোগী। তবে নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর ধারাবাহিকতা পরিস্থিতির গুরুত্ব এখনো স্পষ্ট করছে। চার শিশুর সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনায় মোট প্রাণহানি ৯৬৭-এ পৌঁছানোয় শিশুদের সুরক্ষা, দ্রুত চিকিৎসা এবং রোগ প্রতিরোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।









