খুলনার কয়রা উপজেলার বহু আলোচিত গৃহবধূ অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুমের সাজানো মামলার আসল থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে। যে নারীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে দাবি করে আদালত পর্যন্ত মামলা গড়িয়েছিল, নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ দেড় মাস পর সেই নারীকে রাজধানী ঢাকা থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও জীবিত উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
শুক্রবার খুলনা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে ওই নারী কোনো চাপ বা প্ররোচনা ছাড়াই নিজের স্বেচ্ছায় আত্মগোপনের কথা স্বীকার করে বিস্তারিত জবানবন্দি দেন। আদালতের আইনি প্রক্রিয়া শেষে বিচারক তাঁকে নিজ পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তরের আদেশ দেন। এর মাধ্যমেই অবসান ঘটে দেড় মাসের রহস্যময় নাটকীয়তার।
তদন্ত সংস্থা পিবিআই সূত্রের নথিপত্র অনুযায়ী, এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত ১১ জুলাই। কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামের ৩৬ বছর বয়সী গৃহবধূ আয়শা খাতুন হুট করেই নিখোঁজ হয়ে যান। মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার তিন সপ্তাহ পর, অর্থাৎ ৩ আগস্ট আয়শার মা আমেনা খাতুন বাদী হয়ে খুলনা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে এক লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। মামলায় আয়শার স্বামী ইসলাম সরদারকে প্রধান আসামি করে মোট তিনজনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ তোলা হয়।
মামলার আরজিতে দাবি করা হয়, ১১ জুলাই স্থানীয় মসজিদকুড় ব্রিজের ওপর থেকে আয়শাকে একটি মাইক্রোবাসে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। অপহরণের পর আসামিরা মোবাইল ফোনে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। নির্ধারিত টাকা না পেয়ে আসামিরা আয়শাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলে—এমনটাই বলা হয় মামলায়।
বিষয়টির স্পর্শকাতরতা উপলব্ধি করে বিচারক খুলনা জেলা পিবিআইকে সরাসরি মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েই মাঠে নামে পিবিআইয়ের একটি চৌকস দল। তথ্যপ্রযুক্তির সুনির্দিষ্ট ব্যবহার, গোপন নজরদারি এবং ধারাবাহিক অনুসন্ধানের পর পিবিআই আভিযানিক দল নিশ্চিত হয় যে নিখোঁজ আয়শা বাস্তবে জীবিত এবং তিনি ঢাকার একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থান করছেন। এরপরই গত বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার সংশ্লিষ্ট এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা কার্যালয়ে নিয়ে আসে।
জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে আসে ভিন্ন প্রেক্ষাপট। স্বামী ইসলাম সরদারের সাথে দীর্ঘ দিন ধরে আয়শার চরম পারিবারিক অসন্তোষ ও বনিবনা হচ্ছিল না। আয়শা কোনো অবস্থাতেই সেই সংসার বজায় রাখতে রাজি ছিলেন না। অন্যদিকে তাঁর বাবা-মা বিষয়টি না মেনে জোরজবরদস্তি করে বারবার তাকে স্বামীর ঘরে ফিরিয়ে দিতেন। সংসারের টানাপোড়েন ও স্বজনদের ধারাবাহিক পারিবারিক চাপে অতিষ্ঠ হয়ে একপর্যায়ে আয়শা গৃহত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। কারও সাথে কোনো যোগাযোগ না রেখে তিনি সোজা ঢাকায় চলে আসেন এবং পরিচয় গোপন করে বসবাস শুরু করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতে এই দীর্ঘ সময় তিনি কোনো ধরনের মোবাইল ফোন কিংবা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার পর্যন্ত করেননি।
ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে পিবিআই খুলনার পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন নিশ্চিত করেছেন যে, পারিবারিক কোন্দল থেকে বাঁচতেই ওই নারী আত্মগোপনে গিয়েছিলেন। প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয় এবং নিরপরাধ স্বামীসহ অন্যান্য আসামিরা আইনি জটিলতা থেকে রেহাই পান। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উদ্ধারকৃত নারীকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।









