জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

নেপালে বৃষ্টি ছাড়াই ভয়াবহ ঢল, রহস্য খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা

নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী দুর্গম পার্বত্য এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পাহাড়ের ওপর থেকে কাদা, পাথর, বরফ ও পানির প্রবল স্রোত নেমে এসে মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি, সড়ক ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আকস্মিকতার কারণে অনেক বাসিন্দা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগও পাননি। এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জন বিদেশি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। তবে প্রাথমিক বিশ্লেষণে একটি সম্ভাব্য চিত্র সামনে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, পাহাড়ের বড় একটি অংশ ধসে পড়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দিয়েছিল। এর ফলে নদীতে সাময়িকভাবে পানির চাপ ও সঞ্চয় তৈরি হয়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে ভয়াবহ ঢলের সৃষ্টি করতে পারে।

ভূমিকম্পের চেয়ে ভূমিধসই কি বড় কারণ

দুর্যোগের পর নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল প্রথমে ধারণা করেছিলেন, কোনো ভূমিকম্পের প্রভাবে ভূমিধসের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভূমিধসের কারণে নদীর পথ বন্ধ হয়ে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হতে পারে। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।

তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার বিশ্লেষণে ভিন্ন একটি সম্ভাবনা উঠে এসেছে। সংস্থাটি ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূকম্পন শনাক্ত করেছিল। প্রথমে সেটিকে ভূমিধসের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে এমন সম্ভাবনাও বিবেচনায় আসে যে, ভূমিধসের প্রভাবেই ওই ভূকম্পন সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণেও সীমান্তের চীনা অংশে বড় ধরনের অস্বাভাবিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির ভূতথ্য বিশ্লেষক সার্থক শ্রেষ্ঠের মতে, নেপালের অংশে পাথর ও বরফের বড় ধস লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দিতে পারে। সেই বাধা ভেঙেই আকস্মিক প্রবল ঢল নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

বৃষ্টি না থাকলেও এত ভয়াবহ ঢল কেন

ঘটনার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকা ও আশপাশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না হওয়ায় দুর্যোগটি আরও বিস্ময় তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সান আন্তোনিও শাখার জলবিজ্ঞানী হাতিম শরিফের মতে, এত কম বৃষ্টির পর এমন ভয়াবহ ঢল অস্বাভাবিক।

সাধারণ বন্যার ক্ষেত্রে অতিবৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি কিংবা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মাধ্যমে মানুষ কিছুটা আগাম সতর্ক হতে পারে। কিন্তু ভূমিধসের কারণে নদীর পথ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই জমে থাকা পানি ও ধ্বংসাবশেষের বাধা ভেঙে নিচের দিকে প্রবল স্রোত নেমে আসতে পারে।

এই ধরনের ঢলে শুধু পানি থাকে না। কাদা, বড় পাথর, গাছের গুঁড়ি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ পানির সঙ্গে মিশে স্রোতকে অত্যন্ত ভারী ও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে গাড়িতে করে পালানোর সুযোগও অনেক সময় থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত উঁচু এলাকায় সরে যাওয়াই তুলনামূলক নিরাপদ ব্যবস্থা হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

নতুন ঢলের আশঙ্কাও রয়েছে

দুর্যোগের পর আরেকটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উজানের কিছু এলাকায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এখনো বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থার জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং সতর্ক করেছেন, উজানে পানি আটকে থাকলে নতুন করে আরও শক্তিশালী ঢল সৃষ্টি হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডরোথি হাইনরিখও হিমালয়ের নদীগুলোর গঠন নিয়ে সতর্ক করেছেন। পার্বত্য অঞ্চলের অনেক নদী সরু ও গভীর উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। সেখানে ভূমিধস বা তুষারধসের কারণে নদীর পথ সাময়িকভাবে বন্ধ হলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পানি জমতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে নিচের দিকে ভয়াবহ স্রোত নেমে আসার আশঙ্কা থাকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা

নেপালের এবারের বিপর্যয়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো যাচ্ছে না। এর জন্য আরও তথ্য সংগ্রহ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

তবে হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের পশ্চাদপসরণ এবং বরফ গলার মতো পরিবর্তন ঘটছে। এসব পরিবর্তন পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও জলপ্রবাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে ভূমিধস, হিমবাহ-সংক্রান্ত বন্যা এবং আকস্মিক ঢলের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

হিমবাহের বরফ গলে পাহাড়ি হ্রদে বিপুল পরিমাণ পানি জমে গেলে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা হতে পারে। নেপালসহ হিমালয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ এ ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তবে এবারের ঘটনায় হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক বন্যা সরাসরি দায়ী কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

এর আগেও নেপালে আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের জুলাইয়ে চীনের গিয়িরং অঞ্চল থেকে নেমে আসা প্রবল ঢল নেপালের রসুয়া জেলায় আঘাত হেনেছিল। সেই অভিজ্ঞতাও হিমালয় অঞ্চলে সীমান্তবর্তী নদী ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আগাম সতর্কতায় নতুন ভাবনার প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের বিপর্যয় বিশ্লেষণে শুধু বৃষ্টিপাতের তথ্য যথেষ্ট হবে না। পাহাড়ের বরফ ও হিমবাহের অবস্থা, নদীর প্রবাহ, ভূমির স্থিতিশীলতা এবং সম্ভাব্য ভূমিধস—সব বিষয়কে একসঙ্গে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে আগামী দিনে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও আলাদা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা হতে পারে। বর্তমান উষ্ণ জলবায়ুতে এ ধরনের দুর্যোগের সম্ভাবনা অতীতের তুলনায় কীভাবে বদলেছে, সেটিও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় তাই শুধু একটি আকস্মিক বন্যা বা ভূমিধসের ঘটনা নয়। এটি হিমালয়ের পরিবর্তনশীল পরিবেশ, পাহাড়ি নদীর অনিশ্চিত গতিপথ এবং দুর্গম অঞ্চলে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পাহাড়, নদী, হিমবাহ ও আবহাওয়ার তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে আরও কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বড় চ্যালেঞ্জ।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর