জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের পাঁচ দশক, আজও অম্লান তাঁর সৃষ্টির শক্তি

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা সাহিত্যের এই বিদ্রোহী কবি। তাঁর মৃত্যুর পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও অন্যায়, শোষণ, বৈষম্য ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে উচ্চারিত কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম এখনো বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চেতনায় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

১৮৯৯ সালের ২৪ মে, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। শৈশব কেটেছে দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে। জীবিকার প্রয়োজনে তাঁকে বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছে। পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এবং সাহিত্যচর্চার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন ও চিন্তাজগতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

নজরুলের সাহিত্যিক জীবন ছিল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত। মাত্র ২৩ বছরের সৃষ্টিশীল সময়ে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে যে বিপুল অবদান রেখে গেছেন, তা তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধসহ সাহিত্যের নানা শাখায় তিনি কাজ করেছেন। একই সঙ্গে সৃষ্টি করেছেন হামদ, নাত, গজল ও শ্যামাসংগীত। ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবতা, সাম্য এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল।

তাঁর কবিতায় যেমন বিদ্রোহের ভাষা রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রেম, সাম্য ও মানবিকতার আহ্বান। ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক বৈষম্য এবং শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী তৎকালীন সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর বিখ্যাত উচ্চারণ—‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য’—তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তার দুই দিককেই তুলে ধরে।

বাংলাদেশের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয় এবং ঢাকার ধানমন্ডিতে তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়।

১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার বা ডি-লিট উপাধিতে ভূষিত করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এসব স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে নজরুলের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট, ১২ ভাদ্র, ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে, বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কবির জীবনাবসান ঘটে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধি আজও নজরুলপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান।

মৃত্যুর ৫০ বছর পরও নজরুলের সাহিত্য শুধু অতীতের স্মারক হয়ে থাকেনি। মানুষের অধিকার, সাম্য, সামাজিক ন্যায় এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর উচ্চারণ নতুন প্রজন্মের কাছেও আলোচনার বিষয়। বাংলা গান ও কবিতার জগতেও তাঁর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী।

মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছরের মতো এবারও বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ১২ ভাদ্র সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে শোভাযাত্রা করে কবির সমাধিতে যাবেন। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠের পর সমাধি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা।

নজরুলের প্রয়াণের পাঁচ দশক পূর্ণ হলেও তাঁর সৃষ্টির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। বরং সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর সাম্য, মানবতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বাণী নতুন নতুন প্রেক্ষাপটে পাঠ করা হচ্ছে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান তাই আজও গভীরভাবে স্মরণীয়।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর