দেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিললেও সামগ্রিকভাবে এখনো নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। নতুন সরকারের প্রথম আট মাসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই সময়ের মধ্যে দেশের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার মানুষ।
সোমবার সকালে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে অবস্থিত সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সংলাপের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন ও আলোচনায় অংশ নেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
Table of Contents
শিল্প খাতে গভীর সংকট ও কর্মসংস্থানহীনতা
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট এই আট মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানায় কর্মরত মোট ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক ও কর্মচারী সরাসরি তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। মূলত টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসের মতো গ্যাসনির্ভর ভারী শিল্পগুলো এই সংকটের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে। শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার দৈনিক ১ হাজার ১৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও, যেখানে প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশে ঠেকেছে।
সূচকের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের বিস্তারিত পর্যালোচনা তুলে ধরে সিপিডি জানায়, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ মাত্র ১২টি খাতে কিছুটা অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং মাথাপিছু ঋণের মতো বাকি ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে তীব্র অবনতি ও গভীর শঙ্কা কাটেনি।
সংলাপে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে কিছু কাঠামোগত সমস্যা ও ভঙ্গুর বৈশ্বিক পরিস্থিতি পেয়েছিল। তবে সরকারের একটি বড় দুর্বলতা হলো—দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর কোনো সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি না করা। ফলে এখন সরকারের বিভিন্ন নীতিগত বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব পরিসংখ্যানের হিসাব মেলাতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে জটিলতা। সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি
খাতওয়ারি মূল্যায়নে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের জীবনে পুরোপুরি স্বস্তি না ফিরলেও মূল্যস্ফীতিতে সামান্য উন্নতি হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৭ দশমিক ২ শতাংশে। তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ থেকে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও মূল্যস্ফীতির চাপে প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক পর্যায়েই রয়ে গেছে।
সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ ও সুশাসনের ঘাটতি
অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের কথাও স্বীকার করেছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, অপ্রকাশিত বা কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, ডিজিটাল ই-রিটার্ন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং পোশাকশিল্পের বাইরে অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দেওয়া। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) স্বাক্ষর, ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ উদ্যোগ চালু, ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মেট্রো ও ট্রেনে ২৫ শতাংশ ছাড় এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করার মতো পদক্ষেপগুলোকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে সুশাসনের ক্ষেত্রে কিছু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পরও মব সহিংসতা, নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।
অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের মূল্যায়নের এক পলক
| সূচক বা খাত | আগের অবস্থা / লক্ষ্যমাত্রা | বর্তমান পরিস্থিতি | মূল্যায়নের ধরন |
| বন্ধ হওয়া কারখানা | নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না | ৯৫টি কারখানা বন্ধ | নেতিবাচক |
| বেকার হওয়া কর্মী | শূন্য | ৬১,৮৮১ জন কর্মী | নেতিবাচক |
| সার্বিক মূল্যস্ফীতি | ৯.১ শতাংশ | ৮.৩ শতাংশ | সামান্য ইতিবাচক |
| খাদ্য মূল্যস্ফীতি | ৯.৩ শতাংশ | ৭.২ শতাংশ | ইতিবাচক |
| শিল্পে গ্যাস ব্যবহার | ১,১৮৬ এমএমসিএফডি | ১,১৪৮ এমএমসিএফডি | নেতিবাচক |
| বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি | ৫.৬ শতাংশ | ঋণাত্মক ০.১ শতাংশ | নেতিবাচক |
| রাজস্ব ঘাটতি (প্রাক্কলিত) | পূর্ববর্তী অর্থবছরের হার | ১.৩০ থেকে ১.৪০ লক্ষ কোটি টাকা | শঙ্কাযুক্ত |
| প্রধান অর্থনৈতিক সূচক | ৩১টি মোট সূচক | ১২টিতে অগ্রগতি, ১৯টিতে অবনতি | মিশ্র প্রতিক্রিয়া |
| ব্যাংক খাত সংস্কার | অকার্যকর ও দুর্বল ব্যাংক | ৫টি ইসলামী ব্যাংক একীভূত | ইতিবাচক পদক্ষেপ |
| সামাজিক সুবিধা | সাধারণ নিয়ম | প্রবীণদের ভাড়ায় ২৫% ছাড় | ইতিবাচক উদ্যোগ |
সিপিডি মনে করছে, অর্থনীতিকে টেকসই ও গতিশীল করতে হলে সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্প খাতের উৎপাদনমুখী সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা জরুরি। অন্যথায় শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।









