জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

‘উত্তরাধিকার’ ঘিরে আইয়ুব বাচ্চুর গান নিয়ে বিতর্ক

কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর অমর সৃষ্টি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ সংগীত প্রকল্প ‘উত্তরাধিকার’। প্রয়াত এই শিল্পীর জনপ্রিয় ২০টি গান নতুন সংগীতায়োজন ও পরিবেশনায় তুলে ধরেছেন সমসাময়িক শিল্পী ও ব্যান্ডের সদস্যরা। তবে প্রকাশের পর প্রশংসার পাশাপাশি প্রকল্পটির কয়েকটি গান নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। বিশেষ করে ‘ঘুমন্ত শহরে’ গানটির নতুন পরিবেশনা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শ্রোতাদের একাংশের তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা হলো আইয়ুব বাচ্চুকে ঘিরে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা। অ্যালবাম থেকে অর্জিত অর্থ ওই জাদুঘর তৈরির কাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে শুধু গান পুনঃপ্রকাশ নয়, আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতজীবন, স্মৃতি ও সৃষ্টিকে সংরক্ষণের একটি বৃহত্তর উদ্যোগ হিসেবেও প্রকল্পটিকে দেখা হচ্ছে।

আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন উপলক্ষে গত ১৬ আগস্ট ইউটিউবে প্রকাশ করা হয় ‘উত্তরাধিকার’-এর প্রথম গান ‘রুপালি গিটার’। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন বাপ্পা মজুমদার। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি গান প্রকাশিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সাতটি গানের মধ্যে অদিত রহমানের কণ্ঠে ‘ঘুমন্ত শহরে’ গানটিই সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে।

নতুন সংস্করণে মূল গানের সংগীতায়োজনের পাশাপাশি গায়কীতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। অদিত রহমান নিজের গায়কীর স্বতন্ত্র ধরন যুক্ত করেছেন পরিবেশনায়। আর এই পরিবর্তনই আইয়ুব বাচ্চুর একাংশের ভক্তের আপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের বক্তব্য, নতুনত্ব আনার প্রচেষ্টায় গানটির মূল আবেগ, অনুভূতি ও পরিচিত আবেদন অনেকটাই ম্লান হয়েছে। আইয়ুব বাচ্চুর সৃষ্টির স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন ছিল বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু শ্রোতা গানটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ দাবি পূরণ না হলে আইনি পদক্ষেপের কথাও বলেছেন। তবে এসব প্রতিক্রিয়া মূলত শ্রোতাদের ব্যক্তিগত মতামত ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। কোনো আইনি পদক্ষেপ বাস্তবে নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখানে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

একজন শ্রোতা মন্তব্য করেছেন, আইয়ুব বাচ্চুর গানকে এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত হয়নি। তার মতে, নতুন সংস্করণে মূল গানের প্রাণ ও আবেগ খুঁজে পাওয়া কঠিন। অন্য একজনের ভাষ্য, পরিবর্তিত পরিবেশনাটি তার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। এমন আরও নানা মন্তব্যে শ্রোতাদের হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে।

তবে ‘উত্তরাধিকার’ নিয়ে প্রতিক্রিয়ার পুরো চিত্র নেতিবাচক নয়। আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন ঘিরে বিভিন্ন শিল্পী তার গান ও গিটার পরিবেশন করেছেন। এর মধ্যে মোল্লা বাবুর কণ্ঠে ‘কষ্ট কাকে বলে’ গানটির পরিবেশনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা পেয়েছে।

‘উত্তরাধিকার’ ও ‘ঘুমন্ত শহরে’ নিয়ে নিজের অবস্থানও জানিয়েছেন মোল্লা বাবু। তিনি বলেছেন, আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার গান গাইতে চান। তার মতে, প্রকল্পটির অধিকাংশ আয়োজনই সুন্দর হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা দেখে কৌতূহলী হয়ে ‘ঘুমন্ত শহরে’ শুনেছেন তিনি। কিন্তু নতুন পরিবেশনায় আইয়ুব বাচ্চুর মূল গানের পরিচিত আবেদন তার কাছে ধরা পড়েনি।

এদিকে প্রকল্পটি প্রকাশের পর আলোচনায় এসেছে আইয়ুব বাচ্চুর দীর্ঘদিনের সহযাত্রী ও গিটারিস্ট আব্দুল্লাহ আল মাসুদের নাম। তিনি দীর্ঘ সময় এলআরবির সঙ্গে কাজ করেছেন এবং বর্তমানে আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত। আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তার গান, স্মৃতি ও সৃষ্টিকে ঘিরে বিভিন্ন উদ্যোগেও তিনি কাজ করে আসছিলেন।

তবে ‘উত্তরাধিকার’ প্রকল্প নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করতে আব্দুল্লাহ আল মাসুদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির শুরু থেকে প্রকাশ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা কিংবা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তিনি যুক্ত ছিলেন না।

এই বক্তব্যের ফলে বিতর্কে নতুন একটি মাত্রা যুক্ত হয়েছে। কারণ, প্রয়াত শিল্পীর গান নতুন করে পরিবেশনের ক্ষেত্রে শুধু শিল্পীর কণ্ঠ বা সংগীতায়োজনের পরিবর্তন নয়, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা ও অনুমোদনের বিষয়টিও শ্রোতাদের আগ্রহের কেন্দ্রে এসেছে।

আইয়ুব বাচ্চুর গান বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তার কণ্ঠ, গিটারবাদন, সুর ও গীতিকেন্দ্রিক পরিবেশনা কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার কাছে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। তাই তার গান নতুন করে পরিবেশন করার উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি করে। একই সঙ্গে পুরোনো গানের আবেগ ও স্বাতন্ত্র্য কতটা অক্ষুণ্ন রাখা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

‘উত্তরাধিকার’কে ঘিরে চলমান বিতর্ক তাই কেবল একটি গান পছন্দ বা অপছন্দের প্রশ্নে আটকে নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একজন প্রয়াত শিল্পীর সৃষ্টির মর্যাদা রক্ষা, পুরোনো সংগীতকে নতুন প্রজন্মের উপযোগী করে তোলার পদ্ধতি এবং নতুন সংগীতায়োজনের স্বাধীনতার সীমা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনা। শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া, শিল্পীদের বক্তব্য এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের অবস্থান—সব মিলিয়ে আইয়ুব বাচ্চুর সৃষ্টিকে নতুন করে উপস্থাপনের এই উদ্যোগ এখন সংগীতাঙ্গনে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর