জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে বড় পরিবর্তন

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন হাইকোর্ট। উচ্চ আদালত দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন, চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন এবং বাকি ১০ আসামিকে খালাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তৎকালীন বিচারিক আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদের বিচারিক ক্ষমতা কমিয়ে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স, দণ্ডিত আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের ওপর এ রায় ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় সাত বছর ধরে চলা বহুল আলোচিত এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এলো।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা এবং তার সহযোগী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। অপরদিকে নূর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি এবং জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরও ১০ আসামিকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে হাইকোর্টের প্রশ্ন

মামলার নিম্ন আদালতের রায় পর্যালোচনা করতে গিয়ে হাইকোর্ট বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিককে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে ১৬ আসামির প্রত্যেককে একই ধরনের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ বিচারিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা আদালতের বিবেচনায় এসেছে।

একই মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টিও উচ্চ আদালত কঠোরভাবে মূল্যায়ন করেছেন। এ কারণে তৎকালীন বিচারিক আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদের বিচারিক ক্ষমতা সীমিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্তও দেওয়া হয়েছে।

যেভাবে হত্যার শিকার হন নুসরাত

নুসরাত জাহান রাফি ছিলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে তার মা মামলা করেন। অভিযোগের পর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলার তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক নথিতে উঠে আসে, অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষায় অংশ নিতে মাদ্রাসায় যাওয়ার পর তাকে কৌশলে ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

আগুনে গুরুতর দগ্ধ হওয়ার পর নুসরাতকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাকে ফেনী ও ঢাকায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নুসরাতের মৃত্যুর ঘটনায় তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২৮ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। এরপর ২০ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

দ্রুত বিচার শেষ করে মৃত্যুদণ্ড

মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম তুলনামূলক দ্রুত শেষ হয়েছিল। আদালতে মোট ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামিদের বক্তব্য এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় ঘোষণা করা হয়।

সেই রায়ে মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হওয়ায় বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। দণ্ডিত আসামিদের পক্ষ থেকেও আপিল ও জেল আপিল করা হয়।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর রায়

বিচারিক আদালতের রায়ের পর কয়েক বছর ধরে মামলাটি উচ্চ আদালতে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল। ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি শুরু হয়। টানা ১৭ কার্যদিবস শুনানি শেষে গত ২০ আগস্ট আদালত ২৪ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেন।

আজকের রায়ে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বহাল থাকেনি। বরং আসামিদের পৃথক ভূমিকা, মামলার প্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে শাস্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন হাইকোর্ট।

নুসরাত হত্যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত নারী নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি। তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ ও ন্যায়বিচারের দাবি ওঠে। দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কারণে মামলাটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।

হাইকোর্টের আজকের রায়ে সেই বিচারিক সিদ্ধান্তের বড় অংশ পরিবর্তিত হয়েছে। দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল থাকলেও চারজনের সাজা কমেছে এবং ১০ জন খালাস পেয়েছেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে দায়িত্বশীল বিচারিক ভূমিকার প্রশ্নও সামনে এসেছে।

ফলে নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার আজকের রায় শুধু আসামিদের শাস্তির পরিবর্তনের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; একই সঙ্গে ফৌজদারি মামলায় প্রমাণ মূল্যায়ন, আসামিভেদে দায় নির্ধারণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণের গুরুত্বও নতুন করে সামনে এনেছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর