খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ সংহতি এবং জোটগত সামরিক প্রতিশ্রুতির গভীরতা পরখ করতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে জোটভুক্ত কোনো দেশে সীমিত পরিসরে সামরিক অভিযান চালাতে পারেন। মার্কিন একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং ফাঁস হওয়া এক প্রতিবেদনে এমনই চাঞ্চল্যকর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি পৃথক সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, মস্কোর কৌশলগত এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষানীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলা।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সম্ভাব্য রুশ তৎপরতার একাধিক চিত্র বা দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাশিয়া ন্যাটোর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করবে না। তার বদলে সীমান্ত এলাকায় ছোট মাত্রার সামরিক অনুপ্রবেশ বা মারাত্মক সাইবার হামলার পথ বেছে নেওয়া হতে পারে। উত্তর আটলান্টিক চুক্তির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘আর্টিকেল-৫’-এর প্রতি সদস্য দেশগুলো কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তা পরখ করাই হবে মস্কোর প্রধান উদ্দেশ্য। সনদটির এই ধারা অনুযায়ী, জোটের যেকোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ পুরো জোটের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হয় এবং সব দেশ যৌথভাবে সামরিক পদক্ষেপে বাধ্য থাকে। পুতিন এমন এক মাত্রায় হামলা সীমিত রাখতে পারেন, যা সরাসরি বড় সামরিক সংঘাত না ডেকে এনে জোটের মিত্রদের মধ্যে দ্বিধা ও সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি করবে।
মার্কিন ও ন্যাটো সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়া কিংবা নিজ দেশে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে সংঘাত শেষ করার সঠিক পথ খুঁজে না পেয়ে কৌশল বদলে ন্যাটোর দিকে নজর দিচ্ছে ক্রেমলিন। স্পর্শকাতর বাল্টিক অঞ্চল কিংবা পোল্যান্ড মস্কোর সম্ভাব্য এই সামরিক পরিকল্পনার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ন্যাটোর সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র মার্টিন ও’ডনেল সরাসরি নির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ওপর মন্তব্য না করলেও জানিয়েছেন, যেকোনো ধরনের সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সদস্য দেশগুলোর সার্বিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জোটের সার্বিক প্রস্তুতি শতভাগ রাখা হয়েছে।
আকাশসীমা লঙ্ঘন ও নাশকতার প্রমাণ
সম্প্রতি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর আকাশসীমায় রুশ ড্রোন ও সামরিক তৎপরতা লক্ষ্যণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মে মাসে বিস্ফোরকভর্তি একটি রুশ ড্রোন রোমানিয়ার আবাসিক এলাকায় আঘাত হানলে দুজন আহত হন। এর আগে পোল্যান্ডের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশকারী কয়েকটি ড্রোনকে গুলি করে নামায় ন্যাটোর যুদ্ধবিমান। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ঘটনা ঘটে চলতি সপ্তাহে জার্মানির একটি বিমানবন্দরে, যেখানে অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরকভর্তি একটি ড্রোন পাওয়া যায়। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ধারণা, এটি রুশ গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি নাশকতা চেষ্টা। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎসের নেতৃত্বে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠকে বসেছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ওয়াশিংটনের অস্ত্রের টানাপোড়েন
ইউরোপে রাশিয়ার এই বর্ধিত ঝুঁকির খবর এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে আমেরিকার আধুনিক অস্ত্রাগারে টান পড়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, সাম্প্রতিক উত্তেজনার মুখে মার্কিন ‘থাড’ (THAAD) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় ৮০ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হয়ে গেছে। পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মজুত অর্ধেকে নেমে এসেছে।
অস্ত্রের এই ভয়াবহ ঘাটতি ইউরোপীয় সীমান্তে ন্যাটোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সম্ভাব্য তৎপরতা মোকাবিলার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনকে নতুন ভাবনায় ফেলছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের তথ্যমতে, আগের বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাশিয়ার দূরপাল্লার হামলায় ইউক্রেনে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অস্ত্রের সংকট নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উদ্বেগ প্রকাশ করলেও দাবি করেছেন, তাদের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্র রয়েছে এবং তা দ্রুত উৎপাদন করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধান থমকে যাওয়া এবং ওয়াশিংটনের নজর মধ্যপ্রাচ্যে নিবদ্ধ থাকার সুযোগটিকেই হাতছাড়া করতে চাচ্ছেন না পুতিন।
মন্তব্য