খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই আগস্ট ২০২৬, ৫:১০ পিএম

দেশে হাম ও হামের উপসর্গজনিত অসুস্থতার পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম নিশ্চিত হয়েছে ১১৩ শিশুর শরীরে। পাশাপাশি ৯৬৭ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। সব মিলিয়ে এক দিনে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে শনাক্ত বা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০ জনে। সোমবার (৩ আগস্ট) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হলেও নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংক্রমণের চিত্রে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত—উভয় ধরনের রোগীর সংখ্যাই বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৭৫১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও ৯৬ শিশু। এ হিসাবে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪৭। অর্থাৎ, কয়েক মাসের ব্যবধানে হাম-সংশ্লিষ্ট অসুস্থতা ও এর সম্ভাব্য জটিলতায় বিপুলসংখ্যক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
গত ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যানেও সংক্রমণের ব্যাপকতা স্পষ্ট। এ সময়ে ১১৩ শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। আরও ৯৬৭ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। ফলে এক দিনেই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে।
একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯০৮ শিশু। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৯০৬ শিশু। নতুন করে রোগী ভর্তি এবং চিকিৎসা শেষে রোগী ছাড়ার সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি হলেও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিশুর হাসপাতালে আসা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে মৃত্যুর ধারাবাহিক ঘটনাও পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি সামনে আনছে।
১৫ মার্চ থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত সামগ্রিক হিসাব আরও বড় চিত্র তুলে ধরছে। এই সময়ে দেশে হামের উপসর্গ বা সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৩১ হাজার ৫০। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৪০৮ জনের শরীরে। একই সময়ে মোট ১ লাখ ১৩ হাজার ৫২৮ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ১৮৯ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্যের সারসংক্ষেপ—
| সূচক | সংখ্যা |
|---|---|
| হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যু | ৭৫১ |
| নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু | ৯৬ |
| হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যু | ৮৪৭ |
| গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম আক্রান্ত শিশু | ১১৩ |
| গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গযুক্ত শিশু | ৯৬৭ |
| গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে মোট শনাক্ত | ১,০৮০ |
| গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি | ৯০৮ |
| গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র | ৯০৬ |
| মোট সন্দেহজনক হাম রোগী | ১,৩১,০৫০ |
| মোট নিশ্চিত হাম রোগী | ১৬,৪০৮ |
| মোট হাসপাতালে ভর্তি | ১,১৩,৫২৮ |
| মোট ছাড়পত্র পাওয়া রোগী | ১,০৯,১৮৯ |
তবে এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সন্দেহজনক হাম, হামের উপসর্গযুক্ত রোগী এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া রোগী—এই তিন শ্রেণির তথ্য এক নয়। ফলে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া সব শিশুর মৃত্যুর সরাসরি কারণ হাম—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবু হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক শিশুর মৃত্যু, আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং হাসপাতালে ব্যাপক ভর্তি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি, শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণ এবং ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু টিকার পূর্ণ সুরক্ষা পায়নি, তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। সংক্রমণের পর অনেক শিশুর ক্ষেত্রে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে হাম থেকে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা, কানের সংক্রমণ কিংবা মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু বা যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে এসব জটিলতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে। গুরুতর পরিস্থিতিতে এসব জটিলতা মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
এ অবস্থায় আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা, সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং টিকাদান কর্মসূচির আওতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে কোনো শিশুর জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া বা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামগ্রিক হিসাব বলছে, গত কয়েক মাসে হাম ও হামের উপসর্গজনিত অসুস্থতা দেশের বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছে। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। ফলে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সময়মতো চিকিৎসা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং টিকাদান কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে।
মন্তব্য