,

পুকুরে মিলল ১৫ টুকরো দেহ: ১০ দিন পর কাস্টমস সিপাহীর নির্মম পরিণতি

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় নিখোঁজের ১০ দিন পর কমলাপুর কাস্টম হাউসে কর্মরত সিপাহী আবু রায়হান তালুকদার (৪০)-এর গলিত ও খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিজ বাড়ির পাশের একটি পুকুর থেকে ব্যাগ ও কাপড়ের পোটলায় বন্দি অবস্থায় তাঁর মরদেহের ১৫টি টুকরো উদ্ধার করা হয়। চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

রহস্যজনক ব্যাগ উদ্ধার ও মরদেহের শনাক্তকরণ

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকালে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের সোয়াইতপুর উত্তরপাড়া গ্রামে নিহতের বাড়ির পাশের একটি পুকুরে ৩টি ব্যাগ এবং ১টি কাপড়ের পোটলা ভেসে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চারদিকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসীর সন্দেহ হয় এবং তারা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি থানায় অবহিত করেন।

সংবাদ পেয়ে ফুলবাড়ীয়া থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পুকুর থেকে ভাসমান ব্যাগ ও পোটলাগুলো উদ্ধার করে। পরবর্তীতে তা খোলা হলে দেখা যায়, ভেতরে মানুষের খণ্ডিত দেহের অবশেষ রয়েছে। পুলিশ নিশ্চিত করে যে, নৃশংসভাবে আলামত ধ্বংসের উদ্দেশ্যে মরদেহটি কেটে মোট ১৫টি টুকরো করা হয়েছিল। পানিতে দীর্ঘদিন থাকার কারণে দেহের টুকরোগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল।

যেভাবে নিখোঁজ হন আবু রায়হান

নিহত আবু রায়হান তালুকদার কমলাপুর কাস্টম হাউসে সিপাহী পদে কর্মরত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী বিচ্ছেদের পর তিনি একা থাকতেন। চাকরি সূত্রে ঢাকায় অবস্থান করলেও বৃদ্ধ মায়ের দেখভাল করার উদ্দেশ্যে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তিনি গ্রামের বাড়িতে আসতেন। বাড়িতে দেখাশোনার জন্য তিনি রাজু নামের এক কিশোরকে কেয়ারটেকার হিসেবে রেখেছিলেন। তিনি রাজুর সমস্ত পড়াশোনার খরচ ও মাসিক ভাতাও দিতেন।

গত ২৩ জুলাই রাতে ঢাকা থেকে সোয়াইতপুর গ্রামের বাড়িতে আসেন রায়হান। পরদিন ২৪ জুলাই, শুক্রবার সকালে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। পরিবারের অভিযোগ, কেয়ারটেকার রাজু ও তার বন্ধু জিতুল তাকে এগিয়ে দেওয়ার কথা বলে সাথে নিয়ে যান। কিন্তু এরপর থেকেই রায়হানের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায় এবং তিনি নিখোঁজ হন।

হত্যাকাণ্ড ও তদন্তের আলামত:

  • ২৩ জুলাই: ঢাকা থেকে বাড়িতে আগমন।

  • ২৪ জুলাই: বাড়িতে থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ।

  • ২৬ জুলাই: অফিসে না পৌঁছানোয় পরিবারের কাছে সহকর্মীদের ফোন ও নিখোঁজের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া।

  • ২৭ জুলাই: ফুলবাড়ীয়া থানায় নিহতের ভাই নূরুল ইসলাম কর্তৃক জিডি (সাধারণ ডায়েরি) গ্রহণ।

  • ৩১ জুলাই: বাজুয়া নদী থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল কর্তৃক নিহতের চাবির রিং উদ্ধার।

  • ২ আগস্ট: বাড়ির পাশের পুকুর থেকে ১৫ টুকরো করা গলিত মরদেহ উদ্ধার।

স্বজনদের অভিযোগ ও অপরাধের আলামত

নিখোঁজের দুই দিন পর ২৬ জুলাই রায়হানের সহকর্মীরা পরিবারকে জানান যে তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কোনো সন্ধান না পেয়ে ২৭ জুলাই নিহতের বড় ভাই মোঃ নূরুল ইসলাম ফুলবাড়ীয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

জিডির সূত্র ধরে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্ত চলাকালীন গত শুক্রবার (৩১ জুলাই) উপজেলার অনন্তপুর এলাকায় বাজুয়া নদীতে অভিযান চালায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। সেখান থেকে আবু রায়হানের ব্যবহৃত একটি চাবির রিং উদ্ধার করা হয়, যা ক্লুলেস এই ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

নিহতের পরিবারের দাবি, রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই কেয়ারটেকার রাজু ও তার বন্ধু জিতুল এলাকা ছেড়ে আত্মগোপন করেছে। নিহতের টাকায় পড়াশোনা করা কেয়ারটেকার রাজুর এই আত্মগোপন সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে। স্বজনদের ধারণা, আর্থিক লোভ কিংবা পূর্বপরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্রের কারণেই রাজু ও জিতুল মিলে এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

পুলিশের অবস্থান ও আইনগত পদক্ষেপ

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফুলবাড়ীয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাশেদুল হাসান জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে—হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধীরা পরিচয় গোপন ও আলামত ধ্বংসের জন্য দেহ কেটে ১৫ টুকরো করে ব্যাগে ভরে পুকুরে ফেলে দেয়। পানিতে বেশ কিছুদিন থাকায় পচে যাওয়া দেহ থেকে গ্যাস সৃষ্টি হয়ে ব্যাগগুলো উপরে ভেসে ওঠে।

মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং পলাতক রাজু ও জিতুলসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।