জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুলাই ২০২৬, ৮:১১ পিএম

জিন হাজির করে অলৌকিক উপায়ে স্বর্ণালঙ্কার দ্বিগুণ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দুলারহাট থানা পুলিশ সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে তাদের গ্রেফতার করে। এ সময় প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া কিছু স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ ফেব্রুয়ারি সকালে দুলারহাট থানার নুরাবাদ ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মকবুল মুন্সিরবাড়ি এলাকায় ইয়ানুর বেগমের বসতঘরে প্রতারণার ঘটনাটি ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, চক্রটির সদস্যরা অলৌকিকভাবে ‘জিন হাজির’ করার কথা বলে স্বর্ণালঙ্কার দ্বিগুণ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। তাদের কথাবার্তা ও নানা ধরনের কৌশলে বিশ্বাস করে স্থানীয় ১৭ নারী নিজেদের স্বর্ণালঙ্কার তাদের হাতে তুলে দেন।
ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ওজনের মোট ১০ ভরি ১১ আনা স্বর্ণালঙ্কার নেওয়া হয় বলে মামলার তথ্য ও পুলিশের সূত্রে জানা গেছে। এসব স্বর্ণালঙ্কারের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৫ লাখ ৪৬ হাজার টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। স্বর্ণ হাতে পাওয়ার পর প্রতারক চক্রের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যায়।
ঘটনার পর ভুক্তভোগীরা প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন। এরপর থেকে পুলিশ চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। তবে দীর্ঘ সময় তারা আত্মগোপনে থাকায় তাদের আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
গত ২৭ জুলাই বিকেলে চক্রটির সদস্যরা আবারও নুরাবাদ ৫ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় আসে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এবার নতুন করে প্রতারণার উদ্দেশ্যে এলাকায় আসার পর আগের ঘটনার ভুক্তভোগীরা তাদের কয়েকজনকে চিনতে পারেন। স্থানীয়রা কৌশলে চারজনকে আটকে রাখেন এবং পরে পুলিশকে খবর দেন।
খবর পেয়ে দুলারহাট থানার একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে চারজনকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক তথ্য যাচাই শেষে তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন—দুলারহাট উপজেলার নুরাবাদ এলাকার মৃত আব্দুল লতিফের মেয়ে মোসা. রুমা, ৩০; নাগর চৌকিদারের মেয়ে মোসা. মুক্তা, ২৬; মৃত আব্দুল লতিফ ফরাজীর ছেলে মো. স্বপন ফরাজী, ৫০; এবং স্বপন ফরাজীর ছেলে মো. আলামিন, ২৬।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারের পর আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং তাদের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া কিছু স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে এক জোড়া স্বর্ণের রুলি, যার চাচসহ ওজন ৪ ভরি ১২ আনা এবং আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া এক জোড়া স্বর্ণের ঝুমকা উদ্ধার করা হয়েছে, যার ওজন ১২ আনা ৩ রত্তি। অভিযানে নগদ ৫২ হাজার টাকাও উদ্ধার করা হয়।
তবে পুলিশের দেওয়া তথ্যে স্বর্ণের ওজনের কয়েকটি পরিমাপ গ্রাম হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সেগুলো প্রচলিত ভরি, আনা ও রত্তির হিসাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের সঠিক ওজন ও বাজারমূল্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রয়োজন হতে পারে।
এ ঘটনায় এক ভুক্তভোগীর লিখিত এজাহারের ভিত্তিতে দুলারহাট থানায় দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলা করা হয়েছে। মামলায় বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেফতার চারজনের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুলারহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়াছিন আলম চৌধুরি বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্য পলাতক সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অবশিষ্ট স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধারের জন্যও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রতারণায় সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, অলৌকিকতার প্রতি আস্থা এবং দ্রুত সম্পদ দ্বিগুণ করার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগানো হয়। ফলে অপরিচিত ব্যক্তি বা কোনো চক্র অস্বাভাবিকভাবে স্বর্ণ বা অর্থ দ্বিগুণ করে দেওয়ার দাবি করলে যাচাই ছাড়া তাদের হাতে মূল্যবান সম্পদ তুলে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলার তদন্তের মাধ্যমে চক্রটির কার্যক্রমের পরিধি, অন্য কোনো ভুক্তভোগী রয়েছেন কি না এবং এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া স্বর্ণালঙ্কার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
মন্তব্য