জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুলাই ২০২৬, ২:৫৮ পিএম

বাংলা ভাষার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার সংগ্রামের কথা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ১৯৫২ সালের মহান ২১শে ফেব্রুয়ারির কথা। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে রচিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবময় ও রক্তঝরা ইতিহাস। তবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় মাতৃভাষাকে রক্ষার জন্য যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস রয়েছে, তা আজও বিশ্বজুড়ে সচেতন বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে এক সমান গৌরব ও বেদনার স্মারক।
আজ ২১ জুলাই। ১৯৮৬ সালের এই দিনে আসামের করিমগঞ্জে মাতৃভাষা বাংলার দাপ্তরিক ও শিক্ষাগত অধিকার রক্ষার আন্দোলনে পুলিশের নির্মম গুলিতে শহীদ হন জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাশ। তাঁদের এই আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩-এ।
Table of Contents
বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় মূলত ১৯৬০ সালে। ওই বছরের এপ্রিলে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি অসমীয়া ভাষাকে সমগ্র রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অথচ আসামের কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি—এই তিন জেলা সমন্বয়ে গঠিত বরাক উপত্যকার সিংহভাগ মানুষের প্রধান মাতৃভাষা ছিল বাংলা। সরকারের এই একপাক্ষিক ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো উপত্যকা।
ভাষা আন্দোলনের তৎকালীন সময়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অবস্থানরত বাঙালি অধিবাসীদের ওপর নেমে আসে চরম জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক নির্যাতন। হাজার হাজার বাঙালি নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে প্রাণভয়ে পালাতে বাধ্য হন। সরকারি তদন্ত কমিশনের তৎকালীন তথ্যসূত্রে জানা যায়, শুধু কামরূপ জেলার ২৫টি গ্রামে ৪,০১৯টি কুঁড়েঘর ও ৫৮টি পাকা বাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। এতে বহু মানুষ মারাত্মক আহত হন এবং অন্তত নয়জন বাঙালি প্রাণ হারান। এই চরম শঙ্কার মধ্য দিয়েই মাতৃভাষার সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬১ সালের ১৯ মে বাংলা ভাষাকে বরাক উপত্যকার দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণার দাবিতে শিলচর রেলস্টেশনে (বর্তমানে শিলচর ভাষা শহীদ স্টেশন) শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কিন্তু সেই অহিংস আন্দোলনে আসাম পুলিশের অস্ত্র গর্জে ওঠে। পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করলে ঘটনাস্থলেই রক্তে ভেসে যায় রেলের প্ল্যাটফর্ম।
সেদিন বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় রাজপথে প্রাণ বিসর্জন দেন ১১ জন বীর সন্তান। তাঁদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী কমলা ভট্টাচার্য ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম নারী ভাষা শহীদ। এই অমর ১১ জন শহীদের আত্মত্যাগের পর আসাম সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং বরাক উপত্যকায় বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেয়। বরাকের মানুষের কাছে প্রতি বছরের ১৯ মে হলো তাঁদের নিজস্ব ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’।
ভাষার সেই সাংবিধানিক অধিকার অর্জিত হলেও সংগ্রাম পুরোপুরি শেষ হয়নি। দীর্ঘ আড়াই দশক পর, ১৯৮৬ সালে আসাম সরকার বরাক উপত্যকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে মাধ্যমিক স্তরে অসমীয়া ভাষাকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর প্রতিবাদে আবারও রাজপথে নেমে আসে উপত্যকার ছাত্র-জনতা।
১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী করিমগঞ্জ সফরে এলে তাঁর উপস্থিতিতে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। মিছিলে পুলিশ পুনরায় গুলি চালালে জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাশ নামের দুই তরুণ আন্দোলনকারী শহীদ হন। তাঁদের বলিদান প্রমাণ করে যে, মাতৃভাষার অধিকার কোনো দয়া বা দান নয়, বরং এটি সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতে হয়।
বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় যাঁরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো:

কানাইলাল নিয়োগী (১৯ মে ১৯৬১, শিলচর)
চণ্ডীচরণ সূত্রধর (১৯ মে ১৯৬১, শিলচর)
হিতেশ বিশ্বাস (১৯ মে ১৯৬১, শিলচর)
সত্যেন্দ্র দেব (১৯ মে ১৯৬১, শিলচর)
কুমুদরঞ্জন দাস (১৯ মে ১৯৬১, শিলচর)
সুনীল সরকার (১৯ মে ১৯৬১, শিলচর)
তরণী দেবনাথ (১৯ মে ১৯৬১, শিলচর)
শচীন্দ্র চন্দ্র পাল (১৯ মে ১৯৬১, শিলচর)
বীরেন্দ্র সূত্রধর (১৯ মে ১৯৬১, শিলচর)
সুকমল পুরকায়স্থ (১৯ মে ১৯৬১, শিলচর)
কমলা ভট্টাচার্য (১৯ মে ১৯৬১, শিলচর)
জগন্ময় দেব (২১ জুলাই ১৯৮৬, করিমগঞ্জ)
দিব্যেন্দু দাশ (২১ জুলাই ১৯৮৬, করিমগঞ্জ)
বরাক উপত্যকার এই ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস কেবল বাংলা ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাংলা ভাষার পাশাপাশি নিজস্ব ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির আন্দোলন করতে গিয়ে মণিপুরি কন্যা সুদেষ্ণা সিংহ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেন। ভাষাগত সংস্কৃতি ও অধিকার রক্ষার এই মেলবন্ধন পুরো অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
বাংলা ভাষা কোনো সাধারণ যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আমাদের আত্মপরিচয়, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বেঁচে থাকার মূল চালিকাশক্তি। শিলচরের অমর ১১ জন শহীদ এবং করিমগঞ্জের দুই বীর সন্তান জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাশের এই অমলিন আত্মত্যাগ সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য এক চিরন্তন প্রেরণার উৎস। আজকের এই দিনে বরাক উপত্যকাসহ পৃথিবীর সকল ভাষা শহীদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র প্রণতি।
মন্তব্য