খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছিলো এক বিভীষিকাময় মঙ্গলবার। পৃথক দুটি নদীতে অসাবধানতাবশত ঘটে যাওয়া দুই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দুই স্কুলছাত্রের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এক দুবাইপ্রবাসী যুবক নিখোঁজ রয়েছেন। মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পদ্মা নদী ও জেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মহানন্দা নদীতে এই ট্র্যাজেডি ঘটে। এই ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পদ্মা নদীতে ডুবে মৃত দুই কিশোর হলো রিফাত আলী (১৬) ও রাসেল (১৭)। এদের মধ্যে রিফাত সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা হাজীপাড়া গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে। আর রাসেল একই ইউনিয়নের বইড়পাড়া গ্রামের আলমের সন্তান। তারা দুজনেই সুন্দরপুর সুবাগ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। দুই বন্ধুকে একসঙ্গে হারিয়ে তাদের পরিবার ও সহপাঠীদের মাঝে এখন চলছে মাতম।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুরের দিকে তীব্র গরমের মাঝে রিফাত ও রাসেলসহ ৪-৫ জন বন্ধু মিলে আনন্দের সাথে বাইসাইকেল চালিয়ে পদ্মা নদীর আলিমনগর ঘাটে বেড়াতে যায়। নদীর পাড়ে সাইকেলগুলো রেখে তারা সবাই একসঙ্গে পদ্মার পানিতে গোসল করতে নামে। একপর্যায়ে নদীর তীব্র স্রোত ও গভীরতার কারণে রিফাত ও রাসেল পানির নিচে তলিয়ে যেতে থাকে। তাদের অন্য বন্ধুরা টের পেয়ে চিৎকার শুরু করলে আশেপাশের ঘাটের লোকজন ও জেলেরা ছুটে আসেন। তবে ততক্ষণে দুই কিশোর পানির গভীরে হারিয়ে যায়।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। উদ্ধার কাজের গভীরতা বিবেচনায় রাজশাহী থেকে বিশেষ ডুবুরি দলকে জরুরি ভিত্তিতে ডেকে আনা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন অফিসার সাঈদ হাসান শুভ জানান, দুপুর ২টার দিকে তারা পদ্মায় ডুবে যাওয়ার খবর পান। এরপর রাজশাহী থেকে আসা ডুবুরি দলের কয়েক ঘণ্টার অক্লান্ত চেষ্টায় অবশেষে বিকেল পৌনে ৬টার দিকে রাসেলের এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রিফাতের নিথর মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
পদ্মা নদীর এই বুকভাঙা ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রায় একই সময়ে জেলা শহরের মহানন্দা নদীতে ঘটে আরেকটি দুর্ঘটনা। শহরের আরামবাগ মহল্লার রুহুল আমিনের ছেলে সাকিরুল হক (৩৩) নামের এক যুবক নদীতে মাছ ধরতে নেমে নিখোঁজ হন। সাকিরুল মূলত একজন দুবাইপ্রবাসী। মাত্র মাসখানেক আগে তিনি ছুটি কাটাতে সুদূর প্রবাস থেকে নিজের দেশের বাড়িতে ফিরেছিলেন।
মঙ্গলবার দুপুরে দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে শখ করে শহরের রেহাইচর এলাকায় মহানন্দা রাবার ড্যাম সংলগ্ন নদীতে মাছ ধরতে যান সাকিরুল। জাল ফেলার একপর্যায়ে তিনি নদীর গভীর পানিতে তলিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হন। ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার সাঈদ হাসান শুভ জানান, রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মহানন্দায় অনেক খোঁজাখুঁজি করেও নিখোঁজ সাকিরুলের কোনো সন্ধান মেলেনি। অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় রাতের উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছিল।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী নৌ পুলিশ স্টেশনের ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) জীবন চন্দ্র বলেন, “নৌ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা যৌথভাবে কাজ করে পদ্মা থেকে দুই কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করেছে। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে মরদেহ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে মহানন্দায় নিখোঁজ প্রবাসীকে উদ্ধারে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একরামুল হোসাইন এই দুই দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নদীগুলোতে এই সময়ে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় স্রোত ও গভীরতা অনেক বেশি। নৌ পুলিশ পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং তদন্ত শুরু করেছে। বর্ষার এই মৌসুমে সবাইকে নদীতে নামার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানিয়েছে প্রশাসন।
মন্তব্য