জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বাড়ছে রহস্য, লুটপাটের প্রমাণ মেলেনি

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তাঁর তিন মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। ঘটনার পর শুরুতে এটি লুটপাটের উদ্দেশ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হলেও তদন্তে সেই ধারণা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। কারণ, নিহতদের বাসায় থাকা স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে পুলিশ। ফলে হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের মূল বিষয় হয়ে উঠেছে।

রোববার বিকেলে তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ ঘটনাস্থলে আবারও তল্লাশি চালায়। এ সময় ঘরের ভেতরে থাকা স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। একই দিন ভবনের বাইরে পাশাপাশি থাকা দুটি ভবনের মাঝখানের সরু ফাঁকা স্থান থেকে নিহত শাহিনুর বেগম এবং তাঁর এক মেয়ের ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার পালিয়ে যাওয়ার সময় দুটি মুঠোফোন সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছিলেন। পরে স্থানীয় লোকজনের হাতে ধরা পড়ে গণপিটুনির শিকার হওয়ার সময় মুঠোফোন দুটি ওই স্থানে পড়ে যায়। তবে কেন তিনি ফোন দুটি সঙ্গে নিয়েছিলেন, সেটিই এখন তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া মুঠোফোন দুটি এবং অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের ব্যবহৃত ফোনসহ সংশ্লিষ্ট সব নম্বরের কল রেকর্ড ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, যা থেকে অন্তর মজুমদারের সঙ্গে নিহত পরিবারের সদস্যদের পূর্বপরিচয় বা নিয়মিত যোগাযোগের প্রমাণ মেলে। এতে ধারণা আরও জোরালো হয়েছে যে অভিযুক্তের সঙ্গে পরিবারটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এই মামলার সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো ঘটনাস্থলে উপস্থিত পাঁচজনেরই মৃত্যু হয়েছে। শাহিনুর বেগম ও তাঁর তিন মেয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় স্থানীয়দের হাতে আটক হয়ে গণপিটুনির শিকার হন অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁরও মৃত্যু হয়। ফলে ঘটনার প্রত্যক্ষ কোনো জীবিত সাক্ষী নেই। এ কারণে ফরেনসিক আলামত, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা প্রমাণ, ডিজিটাল তথ্য এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই তদন্ত এগিয়ে নিতে হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীপাড়ের একটি ভাড়া বাসায় এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতরা হলেন শাহিনুর বেগম (৪০), তাঁর বড় মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), মেজো মেয়ে নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) এবং ছোট মেয়ে ফাতেমা আক্তার সিপা (১০)।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহিনুর বেগমের স্বামী কামাল হোসেন জীবিকার প্রয়োজনে পরিবার নিয়ে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রাম থেকে রায়পুরে এসে বসবাস শুরু করেন। ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তাঁর মৃত্যু হলে পরিবারের দায়িত্ব পুরোপুরি শাহিনুর বেগমের কাঁধে এসে পড়ে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যান এবং সংসার সামলান।

নিহত বড় মেয়ে সাইমা আক্তার ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছিলেন। মেজো মেয়ে ইকরা দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ছোট মেয়ে সিপা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। পরিবারের একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত (১৬) একটি রড-সিমেন্টের দোকানে কাজ করেন। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি কর্মস্থলে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটিকে ঘিরে সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লুটপাটের উদ্দেশ্য ছিল কি না, ব্যক্তিগত বিরোধ, পরিকল্পিত হামলা কিংবা অন্য কোনো কারণ—কোনো সম্ভাবনাকেই তদন্তের বাইরে রাখা হয়নি।

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন মিয়া বলেন, শুরুতে লুটপাটের উদ্দেশ্যে হামলার ধারণা করা হলেও বাসায় স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ অক্ষত অবস্থায় পাওয়ায় সেই ধারণা অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণেও অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের সঙ্গে নিহত পরিবারের পূর্বপরিচয়ের কোনো প্রমাণ মেলেনি।

তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যেকের মৃত্যু হওয়ায় তদন্ত অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। প্রত্যক্ষ সাক্ষী না থাকায় আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা, ডিজিটাল তথ্য এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমেই প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।

Tags :

Shourav Gurukul

Recent News