খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুন ২০২৬, ১০:৪৯ পিএম

নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলায় এক রাতের ব্যবধানে একটি সংঘবদ্ধ ও সশস্ত্র ডাকাত দলের ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই বর্বরোচিত ও সহিংস হামলায় কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় কর্মরত সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড সাকিব হাছান খাঁনসহ মোট ছয়জন গুরুতরভাবে জখম ও আহত হয়েছেন। একই রাতে উক্ত ডাকাত দলটি পার্শ্ববর্তী আরেকটি বসতবাড়িতে প্রবেশ করে পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটপাট করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুক্রবার (১৯ জুন) দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে আড়াইহাজার উপজেলার হাইজাদী ইউনিয়নের ধন্দী এবং রাইনাদী-আতাদী এলাকায় এই পৃথক ও চাঞ্চল্যকর অপরাধমূলক ঘটনা দুটি সংঘটিত হয়।
Table of Contents
পারিবারিক সূত্র, স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, আড়াইহাজার উপজেলার হাইজাদী ইউনিয়নের ধন্দী গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা সাকিব হাছান খাঁন বর্তমানে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সম্প্রতি ছুটিতে নিজের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। শুক্রবার দিবাগত রাতে ওই এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকার কারণে প্রচণ্ড গরমের সৃষ্টি হয়। তীব্র গরম থেকে একটু স্বস্তি পেতে তিনি তাঁর কয়েকজন স্থানীয় বন্ধুর সাথে বাড়ির অদূরে রাস্তার পাশে একটি ফাঁকা জায়গায় বসে কুশল বিনিময় ও সময় অতিবাহিত করছিলেন।
ঠিক সেই সময়ে, অর্থাৎ রাত আনুমানিক ১টার দিকে হঠাৎ করেই ১০ থেকে ১২ জনের একটি সুসংগঠিত ও সশস্ত্র ডাকাত দল দেশীয় এবং বিভিন্ন মারাত্মক ধারালো অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে উক্ত স্থানে এসে চড়াও হয়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডাকাত দলের সদস্যরা সেখানে অবস্থানরত সাধারণ মানুষের ওপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। তারা নিজেদের কাছে থাকা ধারালো ও তীক্ষ্ণ অস্ত্র দিয়ে সেখানে উপস্থিত লোকজনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে, যার ফলে ঘটনাস্থলেই একটি রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ডাকাতদের এই আকস্মিক ও নৃশংস হামলার ঘটনায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁনসহ তাঁর সাথে থাকা মুকুল (৩৮), রাজিব (৩২), রুবেল (৩৬), ফারুক (৩২) এবং মুকুলের স্ত্রী ডালিয়া (৩৩) মারাত্মকভাবে জখম হন। আক্রান্তদের শরীর থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হলে তারা ও তাদের পরিবারের লোকজন চিৎকার শুরু করেন। আক্রান্তদের বিকট আর্তচিৎকার এবং সার্বিক শোরগোল শুনে আশেপাশের বিভিন্ন বাড়িঘরের লোকজন ও প্রতিবেশীরা নিজেদের সুরক্ষার্থে লাঠিসোটা নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে আসেন।
তখন সাধারণ গ্রামবাসীদের লাঠিসোটা হাতে নিয়ে এভাবে একতাবদ্ধ ও সংগঠিত হয়ে এগিয়ে আসতে দেখে এবং গণধোলাইয়ের ভয়ে ডাকাত দলের সদস্যরা অন্ধকার রাতের সুযোগ নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুততার সাথে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় আশপাশের বাসিন্দারা রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় ওই ছয়জনকে উদ্ধার করেন এবং অনতিবিলম্বে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা আহতদের প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। তবে তাদের শরীরে লাগা জখম ও আঘাতের গভীরতা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বিবেচনা করে এবং অধিকতর উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে রাতেই তাদের জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ধন্দী গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওই একই রাতে ধন্দী গ্রামে এসিল্যান্ড ও তাঁর বন্ধুদের ওপর হিংস্র হামলা চালানোর ঘটনার ঠিক এক ঘণ্টা পর, একই সশস্ত্র ডাকাত দলটি পার্শ্ববর্তী রাইনাদী-আতাদী এলাকায় প্রবেশ করে পুনরায় অপরাধমূলক তৎপরতা চালায়। সেখানে তারা সুমন নামের এক স্থানীয় বাসিন্দার বসতবাড়িতে গভীর রাতে হানা দেয়। ডাকাতেরা অত্যন্ত সুকৌশলে সুমনের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং অস্ত্রের মুখে ঘরের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা পরিবারের সকল সদস্যকে জিম্মি করে ফেলে। এ সময় তারা ঘরের লোকজনকে কোনো ধরনের চিৎকার বা শব্দ না করার জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং অবাধ্য হলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়।
এরপর সশস্ত্র ডাকাত দলটি পুরো ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করে ব্যাপক তল্লাশি ও তাণ্ডব চালায়। তারা ঘরের আলমারিতে অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় রক্ষিত নগদ ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং পরিবারের নারীদের পরিহিত ও বাক্সে সংরক্ষিত থাকা প্রায় ১৪ ভরি ওজনের বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান স্বর্ণালংকার সম্পূর্ণ লুট করে নিয়ে নির্বিঘ্নে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। একই রাতে পরপর দুটি ভিন্ন গ্রামে এমন সুসংগঠিত ও দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা সংঘটিত হওয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক, উদ্বেগ ও তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে।
আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সবজেল হোসেন ঘটনার সত্যতা পুরোপুরি নিশ্চিত করে স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ডাকাতি ও নৃশংস হামলার খবর পাওয়ার পরপরই থানা পুলিশের একটি বিশেষ ও চৌকস দল দ্রুত ধন্দী এবং রাইনাদী-আতাদী এলাকার ঘটনাস্থল দুটি পরিদর্শনে যায়। ডাকাতদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সহকারী কমিশনারসহ বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তবে প্রথম হামলার স্থানটিতে ডাকাতেরা সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে পড়ার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোনো ধরনের মূল্যবান মালামাল বা টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিতে পারেনি বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট এজাহার প্রাপ্তি সাপেক্ষেই নিয়মিত মামলা রুজু করা হবে এবং এই অপরাধের সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারে প্রয়োজনীয় সর্বাত্মক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিষয়ে আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুর রহমান তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করেছেন। তিনি জানান, ডাকাত দলটি প্রথম আক্রমণস্থল থেকে সাধারণ মানুষের তাড়া খেয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় মূলত নিজেদের পথ পরিষ্কার করতে সামনে যাকে পেয়েছে, তাকেই অত্যন্ত নির্মমভাবে কুপিয়ে জখম করে পালানোর চেষ্টা করেছে। এই বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়ে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁন মূলত তাঁর বুকে মারাত্মক ও গভীর আঘাত পেয়েছেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ও জরুরি চিকিৎসা গ্রহণ শেষে বর্তমানে শারীরিক আশঙ্কামুক্ত হয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছেন। এই ধিক্কারজনক ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধী ও ডাকাত দলের সদস্যদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে এবং তাদের গ্রেপ্তার করতে স্থানীয় থানা পুলিশ অত্যন্ত তৎপরতার সাথে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে।
মন্তব্য