খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুন ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম

বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজসেবা এবং নারী মুক্তির ইতিহাসে বেগম সুফিয়া কামাল এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে ছিলেন কবি, প্রগতিশীল সমাজকর্মী, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক আপসহীন কণ্ঠস্বর। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন প্রেম, প্রকৃতি ও মানবতা ফুটে উঠেছে, তেমনি সমাজজীবনে তিনি ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে এক দৃঢ় প্রতীক। কঠোর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও পর্দাপ্রথার মধ্য থেকেও তিনি যেভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তা বাঙালি নারীদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস।
১৯১১ সালের ২০ জুন বৃহত্তর বরিশালের শায়েস্তাবাদের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে সুফিয়া কামাল জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে মুসলিম সমাজে নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং পর্দাপ্রথা ছিল কঠোর। এই প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি নিজের অদম্য ইচ্ছায় স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হন। তিনি তাঁর মাতা সাবেরা খাতুনের কাছ থেকে বাংলা ভাষার প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯২৪ সালে, মাত্র তেরো বছর বয়সে তাঁর মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। তাঁর স্বামী ছিলেন একজন উদার ও আধুনিক চিন্তার মানুষ, যিনি সুফিয়া কামালকে সাহিত্যচর্চায় ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেন। এর ফলে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ সমসাময়িক বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকদের রচনার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন।
বেগম সুফিয়া কামালের সাহিত্যিক ও সামাজিক জীবনের প্রধান প্রধান তথ্যাবলি নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| প্রধান ক্ষেত্রসমূহ | সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য ও বিবরণ |
| জন্ম ও স্থান | ২০ জুন, ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দ; শায়েস্তাবাদ, বৃহত্তর বরিশাল |
| প্রথম সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ | ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘সওগাত’ পত্রিকায় ‘বাসন্তী’ কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে |
| সম্পাদনা | নারী বিষয়ক প্রগতিশীল সাময়িকী ‘বেগম’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক |
| ঐতিহাসিক অবদান | ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ |
| নেতৃত্ব ও সংগঠন | বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি |
| উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ | সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, মন ও জীবন, উদাত্ত পৃথিবী, শান্তি ও প্রার্থনা |
| গল্প, ভ্রমণ ও অন্যান্য গ্রন্থ | কেয়ার কাঁটা (গল্প), সোভিয়েত দিনগুলি (ভ্রমণকাহিনি), একাত্তরের ডায়েরি |
| রাষ্ট্রীয় ও প্রধান পুরস্কারসমূহ | বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার |
| প্রয়াণ দিবস | ২০ নভেম্বর, ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ |
১৯২৬ সালে ‘সওগাত’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই মূলত বাংলা সাহিত্যজগতে তাঁর আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি বাঙালি মুসলিম নারীদের জাগরণের লক্ষ্যে প্রকাশিত ‘বেগম’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং এদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত হন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং নারীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সুফিয়া কামাল পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে অবরুদ্ধ ঢাকাতেই অবস্থান নিয়ে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশে মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে আমৃত্যু নারীদের অধিকার রক্ষা ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধের আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।
সাহিত্য ও সমাজে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পুরস্কার এবং দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত হন। ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর এই মহীয়সী নারী মৃত্যুবরণ করেন। বাঙালি নারীর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের সংগ্রামে বেগম সুফিয়া কামালের নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মন্তব্য