জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

পদোন্নতি বিতর্কে প্রশাসনে বাড়ছে ক্ষোভ ও বিভাজন

জনপ্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ ও ক্ষোভ ক্রমেই প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা এবং প্রচলিত নীতিমালাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিভাজন, হতাশা এবং আস্থার সংকট সৃষ্টি হচ্ছে বলে দাবি করছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব, যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব এবং অতিরিক্ত সচিব থেকে সচিব পদে পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় ধরে বিতর্ক ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা ও সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা এখনও বজায় রয়েছে।

তাদের মতে, পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সমতার অভাব প্রশাসনের ভেতরে পেশাগত ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে একটি ব্যাচের শত শত কর্মকর্তার মধ্য থেকে বাছাই করে সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার পর একই ব্যাচের পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের পুনর্বিবেচনা না করে অন্য ব্যাচের কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বঞ্চিত কর্মকর্তারা দাবি করেন, এই প্রক্রিয়ার ফলে একই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে পদমর্যাদা, দায়িত্ব এবং ক্যারিয়ার অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন একসঙ্গে চাকরিজীবন শুরু করেও অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছেন, যা প্রশাসনের ভেতরে অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক কাঠামোয় জ্যেষ্ঠতা দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত দক্ষতার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, প্রতিষ্ঠিত নীতিমালার পরিবর্তে অন্য বিবেচনা পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পদোন্নতি নীতিমালার যথাযথ অনুসরণ ছাড়াই রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত বিবেচনায় কিছু কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের দাবি, বর্তমান সময়েও সেই প্রবণতার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। তাদের মতে, প্রভাবশালী মহলের সমর্থনপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভেতরে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করেন, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে যদি সুস্পষ্ট, গ্রহণযোগ্য এবং নীতিনির্ভর ব্যবস্থা অনুসরণ না করা হয়, তাহলে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

তাদের মতে, পদোন্নতি শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার অগ্রগতির বিষয় নয়; এটি প্রশাসনের সামগ্রিক কর্মদক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক মনোবলের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। কোনো কর্মকর্তা যদি নিজেকে বঞ্চিত মনে করেন, তাহলে তার প্রভাব কর্মপরিবেশের ওপরও পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি পায় এবং কর্মউদ্দীপনা কমে যায়। এর ফলে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনীহা বা মনোযোগের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।

তাদের মতে, প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নীতিনিষ্ঠ পদোন্নতি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যমান অসন্তোষ অনেকাংশে প্রশমিত হতে পারে। অন্যদিকে, পক্ষপাতমূলক পদোন্নতি ও পদায়নের অভিযোগ অব্যাহত থাকলে প্রশাসনের পেশাদারিত্ব, কার্যকারিতা এবং জনসেবামুখী চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন আরও তীব্র হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিমত, একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জনকল্যাণমুখী প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং জ্যেষ্ঠতাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় প্রশাসনের অভ্যন্তরে সৃষ্ট অসন্তোষ দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হতে পারে, যার প্রভাব রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ও জনসেবার মানের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Tags :

Md. Sakib

Recent News