জুন মাসের মধ্যে বিনিয়োগে আগামী বছর করছাড়ের সুযোগ

চলতি জুন মাস শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে বর্তমান অর্থবছরের শেষ মাস গণনা শুরু হয়েছে। দেশের প্রচলিত কর বিধিমালা অনুযায়ী, জুন মাসের মধ্যেই প্রত্যেক করদাতাকে তাঁদের আয়করের চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করতে হয়। আয়কর বিবরণীতে বার্ষিক আয়-ব্যয় প্রদর্শন, করছাড়ের সুবিধা গ্রহণ এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রণয়ন—সবই এই জুলাই-জুন চক্রের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলস্বরূপ, বিনিয়োগজনিত করছাড় বা কর রেয়াত সুবিধা গ্রহণ করতে হলে করদাতাদের অবশ্যই চলতি জুন মাসের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট খাতসমূহে বিনিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে। যদি কোনো করদাতার হাতে অতিরিক্ত নগদ অর্থ বা সঞ্চয় থাকে, তবে তিনি সরকার নির্ধারিত কিছু সুনির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে বছর শেষে তাঁর প্রদেয় আয়করের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে পারেন।

করছাড় বা রেয়াত পাওয়ার যোগ্য ৯টি নির্দিষ্ট বিনিয়োগ খাত

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) করদাতাদের সুবিধার্থে এবং সঞ্চয় প্রবণতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু খাত নির্ধারণ করে দিয়েছে, যেখানে বিনিয়োগ করলে আইনানুগভাবে কর রেয়াত বা করছাড় পাওয়া যাবে। এই ৯টি খাতের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ১. সঞ্চয়পত্র ক্রয়: বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ, সহজ এবং জনপ্রিয় খাত হলো রাষ্ট্রীয় সঞ্চয়পত্র। এতে কোনো ধরনের আর্থিক ঝুঁকি না থাকায় এবং মুনাফার হার ব্যাংকের সাধারণ আমানতের চেয়ে কিছুটা বেশি হওয়ায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর করদাতাদের কাছে এটি প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচিত হয়।

  • ২. ব্যাংকের ডিপিএস বা সঞ্চয় স্কিম: যেকোনো অনুমোদিত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় করলে এই কর রেয়াত সুবিধা পাওয়া যাবে। ডিপিএসের ওপর বার্ষিক সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বিনিয়োগের ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই করছাড়ের সুবিধা দিয়েছে।

  • ৩. শেয়ারবাজার বা পুজিঁবাজার: শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমেও করদাতারা করছাড় পেতে পারেন। এই সুবিধা গ্রহণের জন্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড অথবা ডিবেঞ্চার ক্রয় করতে হবে।

  • ৪. সরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ড বা ভবিষ্য তহবিল: সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ড বা ভবিষ্য তহবিলে প্রদত্ত নিয়মিত চাঁদার কারণে তাঁদের প্রদেয় করের পরিমাণ হ্রাস পায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের তালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

  • ৫. স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিল: সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি বা অন্য যেকোনো স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিলে নিয়োগকর্তা এবং কর্মকর্তা বা কর্মচারী উভয়ের প্রদত্ত চাঁদাই এনবিআরের করছাড়ের তালিকার আওতাভুক্ত করা হয়েছে।

  • ৬. জীবনবিমার প্রিমিয়াম: করদাতার নিজের বা পরিবারের সদস্যদের নামে করা জীবনবিমার জন্য পরিশোধিত নিয়মিত প্রিমিয়ামের অর্থও কর রেয়াতের জন্য যোগ্য বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয়।

  • ৭. কল্যাণ তহবিল ও গোষ্ঠীবিমার তহবিলে চাঁদা: বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কল্যাণ তহবিল এবং গোষ্ঠীবিমার তহবিলে কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের পক্ষ থেকে প্রদত্ত নিয়মিত মাসিক বা বার্ষিক চাঁদা করছাড়ের তালিকায় রাখা হয়েছে।

  • ৮. সুপার অ্যানুয়েশন ফান্ড বা বার্ধক্য তহবিল: এই বিশেষ তহবিলে প্রদত্ত চাঁদা বা অনুদানের অর্থও বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত পাওয়ার জন্য এনবিআর কর্তৃক অনুমোদিত।

  • ৯. সরকারি সিকিউরিটিজ ক্রয়: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ম অনুসারে, করদাতারা অনধিক ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত যেকোনো ধরনের সরকারি সিকিউরিটিজ ক্রয় করে এই করছাড়ের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।

কর রেয়াত গণনার আইনি নিয়ম ও বিভিন্ন এলাকার ন্যূনতম করের হার

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিধিমালা অনুযায়ী, বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্র বা নিয়ম অনুসরণ করা হয়। একজন করদাতা মোট আয়ের দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ, মোট অনুমোদনযোগ্য বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা—এই তিনটির মধ্যে যে পরিমাণটি সবচেয়ে কম হবে, ঠিক সেই পরিমাণ টাকাই কর রেয়াত বাছাড় হিসেবে পাবেন। তবে আয়কর আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, একজন করদাতার মোট আয়ের ওপর প্রযোজ্য করের চেয়ে যদি আইনানুগ রেয়াতের পরিমাণ বেশি হয়, তাহলে ওই করদাতা কোনো প্রকার কর রেয়াত প্রাপ্য হবেন না। অর্থাৎ, কর রেয়াতের পরিমাণ কখনোই মূল কর দায়ের চেয়ে বেশি হতে পারবে না।

এর পাশাপাশি, করদাতার ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ন্যূনতম কর প্রদানের নিয়ম নির্ধারিত রয়েছে। নিচে সারণির মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকার ন্যূনতম করের হার এবং কর রেয়াত গণনার নিয়মাবলী উপস্থাপন করা হলো:

করদাতার ভৌগোলিক অবস্থান ও এলাকান্যূনতম প্রদেয় করের পরিমাণ (টাকা)কর রেয়াত নির্ধারণের আইনি সূত্র (যেটি কম হবে)
ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন৫,০০০১. মোট আয়ের দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
অন্যান্য সকল সিটি করপোরেশন এলাকা৪,০০০২. মোট অনুমোদনযোগ্য বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ।
সিটি করপোরেশন ব্যতীত দেশের অন্যান্য জেলা ও অঞ্চল৩,০০০৩. সর্বোচ্চ আইনি সীমা ১০ লাখ টাকা।

সরকারি কর্মকর্তা জাহিদ কবিরের আয়কর ও রেয়াত গণনার বাস্তব উদাহরণ

কর রেয়াতের এই নিয়মটি সহজভাবে বোঝার জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তা জাহিদ কবিরের বার্ষিক আয়ের একটি বাস্তব উদাহরণ পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তিনি এক বছরে বেতন-ভাতা, উৎসব বোনাসসহ সব মিলিয়ে সর্বমোট ৩ লাখ ৬৪ thousand টাকা আয় করেছেন। পুরো বছরে তিনি ভবিষ্য তহবিল, কল্যাণ তহবিল ও গোষ্ঠীবিমা তহবিলে মোট ৪১ হাজার ৪০০ টাকা চাঁদা দিয়েছেন, যা তাঁর মোট বিনিয়োগ।

দেশের প্রচলিত কর দায় গণনার হিসাব অনুসারে, প্রথম ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বার্ষিক আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত, অর্থাৎ করের হার শূন্য শতাংশ। এই করমুক্ত সীমা বাদ দেওয়ার পর জাহিদ কবিরের অবশিষ্ট ১৪ হাজার টাকার ওপর নিয়ম অনুসারে ৫ শতাংশ হারে ৭০০ টাকা কর ধার্য হয়। এখন বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত নেওয়ার নিয়ম অনুসারে তাঁর মোট আয়ের (৩ লাখ ৬৪ হাজার টাকা) দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ হলো ১০ হাজার ৯২০ টাকা; এবং তাঁর মোট অনুমোদনযোগ্য বিনিয়োগের (৪১ হাজার ৪০০ টাকার) ১৫ শতাংশ হলো ৬ হাজার ২১০ টাকা। আইন অনুসারে সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা। এই তিনটির মধ্যে সবচেয়ে কম পরিমাণটি হলো ৬ হাজার ২১০ টাকা, যা জাহিদ কবিরের নিয়মমাফিক কর রেয়াতের পরিমাণ। তবে আয়কর আইন অনুসারে, জাহিদ কবির ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার করদাতা হওয়ায় তাঁকে ন্যূনতম কর হিসেবে ৫ হাজার টাকা অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে, কারণ কর রেয়াতের পরিমাণ কখনোই মূল কর দায়ের চেয়ে বেশি হতে পারে না।