স্মরণে বাংলা চলচ্চিত্রের “মিয়া ভাই” অভিনেতা ফারুক

বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা ফারুকের পুরো নাম আকবর হোসেন পাঠান দুলু। জন্ম ১৮ আগস্ট ১৯৪৮ সালে। তাঁদের আদি পিতৃভূমি ছিল মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায়। তবে তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের বড় একটি সময় কেটেছে পুরান ঢাকার প্রাণচঞ্চল পরিবেশে।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন রাজনীতি সচেতন। স্কুল জীবনেই যুক্ত হন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলন-সংগ্রামের সেই দিনগুলোতে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছিল প্রায় ৩৭টি মামলা। এরপর মহান মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নেন সাহসিকতার সঙ্গে।
১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত জলছবি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। তবে অভিনয়ের প্রকৃত শক্তিমত্তা প্রকাশ পেতে শুরু করে স্বাধীনতার পর। ১৯৭৩ সালে খান আতাউর রহমান পরিচালিত আবার তোরা মানুষ হ এবং ১৯৭৪ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত আলোর মিছিল—এই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র দুটিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নজর কাড়েন।
১৯৭৫ সাল ছিল তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। গ্রামীণ পটভূমিতে নির্মিত সুজন সখী ও লাঠিয়াল চলচ্চিত্র তাঁকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। লাঠিয়াল চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনি অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে।
এরপর একের পর এক সফল চলচ্চিত্রে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সিনেমার অপরিহার্য মুখ। নয়নমনি, মাটির মায়া, সূর্যগ্রহণ, সারেং বৌ, গোলাপী এখন ট্রেনে, দিন যায় কথা থাকে, সাহেব, কথা দিলাম, মাটির পুতুল, ছোট মা, ঘরজামাই—প্রতিটি চলচ্চিত্রে তিনি নিজস্ব অভিনয়গুণে দর্শকের হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে নেন।
বিশেষ করে শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সারেং বৌ এবং আমজাদ হোসেন পরিচালিত গোলাপী এখন ট্রেনে চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। নারীকেন্দ্রিক গল্পের মধ্যেও তিনি তাঁর চরিত্রকে করে তুলেছিলেন জীবন্ত ও স্মরণীয়।
১৯৮০ সালে সখী তুমি কার চলচ্চিত্রে শহুরে ধনী যুবকের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেন—শুধু গ্রামীণ নয়, শহুরে চরিত্রেও তিনি সমান সাবলীল।
আর ১৯৮৭ সালে মিয়া ভাই চলচ্চিত্রের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর দর্শকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নতুন পরিচয়—“মিয়া ভাই”। সেই নামই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচিতি।
চলচ্চিত্রের বাইরেও তিনি ছিলেন সফল ব্যবসায়ী। গাজীপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ফারুক নিটিং ডাইং এন্ড ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি, যার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
ব্যক্তিজীবনে ভালোবেসে বিয়ে করেন ফারজানা পাঠানকে। তাঁদের সংসারজুড়ে ছিল দুই সন্তান—কন্যা ফারিহা তাবাসসুম পাঠান এবং পুত্র রওশন হোসেন।
১৫ মে ২০২৩ সালে এই জনপ্রিয় অভিনেতা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তবে বেদনার বিষয়, মৃত্যুর কিছুদিন আগেই না ফেরার দেশে চলে গিয়েছিলেন তাঁর জীবনসঙ্গিনীও। যেন সুজন সখীর সেই “সুজন” শেষ পর্যন্ত তাঁর “সখী”কে হারিয়েই বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে।
বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে তাঁর মতো শিল্পীরা কখনও হারিয়ে যান না। তাঁরা রয়ে যান তাঁদের অভিনীত চরিত্রে, সংলাপে, মানুষের ভালোবাসায় এবং স্মৃতির গভীরে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, মিয়া ভাই।
বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শক আপনাকে আজও ভালোবাসে, আগামীতেও ভালোবাসবে।