ঈদে নতুন টাকার উচ্চ চাহিদা ও টাঁকশালের সীমাবদ্ধতা

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে নতুন কাগুজে মুদ্রার চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত ধর্মীয় উৎসবগুলোতে নতুন নোটের মাধ্যমে লেনদেনের একটি সংস্কৃতি থাকায় প্রতিবছর এই সময়ে বাজারে মুদ্রার প্রবাহ বাড়ানো হয়। তবে এবার নতুন নকশার নোট ছাপানোর প্রক্রিয়া এবং কাঁচামালের অপর্যাপ্ততার কারণে চাহিদার বিপরীতে জোগানে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং টাকা ছাপানোর একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (টাঁকশাল) সূত্রে এই পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

নতুন নোটের চাহিদা ও উৎপাদন সক্ষমতার তুলনা

ঈদের আগে বাজারে পর্যাপ্ত মুদ্রার সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ টাঁকশালের কাছে ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোটের চাহিদাপত্র পাঠিয়েছে। তবে টাঁকশাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, বর্তমানে কাগজ ও কালির তীব্র সংকট থাকায় তারা চাহিদার মাত্র অর্ধেক অর্থাৎ ৮ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করতে পারবে। মুদ্রার এই জোগান ও মজুত সংক্রান্ত তথ্য নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

মুদ্রার বিবরণপরিমাণ (কোটি টাকায়)
ঈদে নতুন নোটের মোট চাহিদা১৬,০০০
টাঁকশালের বর্তমান সরবরাহ সক্ষমতা৮,০০০
টাঁকশালে মজুদ থাকা পুরোনো নকশার নোট১৫,৮০০
ব্যাংকগুলোর ভল্টে থাকা মুদ্রার স্থিতি১৬,০০০ – ২০,০০০
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংরক্ষিত ভল্টে স্থিতি১৪,০০০ – ১৮,০০০

নকশা পরিবর্তন ও নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব

২০২৪ সালের আগস্ট মাসের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সকল মূল্যমানের নোটের নকশা পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আগের নকশার নোটে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ছিল, যা বর্তমানে না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। টাঁকশালে বর্তমানে ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা মূল্যের শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত অর্ধপ্রস্তুত নোট মজুদ থাকলেও নীতিগত কারণে সেগুলো বাজারে আসছে না। নতুন নকশার নোট বাজারে আনতে সাধারণত ১০ থেকে ১৮ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে বিমানযোগে কাগজ ও কালি আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে সেই নোটগুলো ঈদের আগে বাজারে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

বাজারে ছেঁড়া-ফাটা নোটের আধিক্য ও প্রতিকার

দীর্ঘদিন ধরে নতুন নোটের সরবরাহ কম থাকায় এবং গত দুই ঈদে নতুন টাকা বাজারে না ছাড়ায় সাধারণ মানুষের হাতে থাকা নোটের মান কমেছে। বর্তমানে বাজারে প্রচুর পরিমাণে ছেঁড়া, ফাটা এবং ময়লাযুক্ত নোট দেখা যাচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব হলো বাজার থেকে এসব অযোগ্য নোট তুলে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া এবং সমমূল্যের পরিষ্কার নোট সংগ্রহ করা। কিন্তু ব্যাংকগুলো চাহিদামতো নতুন নোট না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ছেঁড়া-ফাটা নোটই পুনরায় প্রদান করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ক্লিন নোট পলিসি’ বা পরিচ্ছন্ন মুদ্রা নীতিমালা থাকলেও পর্যাপ্ত জোগানের অভাবে এর সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বর্তমান অবস্থান

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের মতে, নতুন নকশার নোট আনার প্রক্রিয়াকালীন সময়ের কারণেই এই সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে একটি একটি করে নোটের নকশা বদলানো হয়, কিন্তু এবার বিশেষ পরিস্থিতির কারণে একযোগে সব নোটের নকশা বদলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি টাকা বদলানোর সুবিধা গত বছরের নভেম্বর থেকে বন্ধ থাকায় সাধারণ গ্রাহকরা এখন সম্পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তবে কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করছে যে, শীঘ্রই ব্যাংকগুলোকে নতুন নোট প্রদান শুরু হবে এবং ঈদের আগে বাজারে মুদ্রার প্রবাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে। বর্তমানে বাজারে প্রচলিত ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের কাগুজে মুদ্রার বিপরীতে নতুন নোটের এই সংযোজন তারল্য ব্যবস্থাপনা সহজতর করবে।