খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই মে ২০২৬, ১১:৩৫ এএম

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পক্ষ থেকে যে সংস্কারের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তার প্রভাব এখন দেশের বীমা খাতের ওপর ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ব্যাংক খাতের পর বীমা খাতের সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বীমা খাতের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, গ্রাহক সেবার মানোন্নয়ন এবং দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা দূর করতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
Table of Contents
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বর্ধিত ঋণ সুবিধা এবং অন্যান্য সহায়তা কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের আর্থিক খাতের প্রতিটি স্তম্ভকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বাংলাদেশের জন্য প্রায় ৪.১ বিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তীতে আরও ১.৪ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে সংস্থাটির প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে আর্থিক খাতের সংস্কারের অগ্রগতি মূল্যায়ন করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৭ শতাংশে নেমে এলেও, বীমা ও ব্যাংক খাতের সংস্কার সফল হলে ২০২৬ সাল থেকে প্রবৃদ্ধি পুনরায় ইতিবাচক ধারায় ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বীমা খাতের অবদান প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। বর্তমানে দেশে বীমা পেনিট্রেশনের হার মাত্র ০.৩৩ শতাংশ থেকে ০.৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, বীমা খাতের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা নিচে টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| খাতের বিবরণ | তথ্যের পরিমাণ (কোটি টাকা) |
| মোট বীমা প্রিমিয়াম (২০২৪-২৫) | ১৮,৫৩৪ |
| লাইফ বীমা প্রিমিয়াম | ১২,০৪২ |
| সাধারণ বীমা প্রিমিয়াম | ৬,৪৯২ |
| মোট লাইফ ফান্ডের পরিমাণ | ৩৪,৬৫০ |
| জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান | ০.৩৩% – ০.৪% |
বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বীমা বাজার অনেক পিছিয়ে রয়েছে। লুক্সেমবার্গে এই হার ৩৩ শতাংশ এবং উন্নত দেশগুলোর গড় হার ৬.২ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা ১ শতাংশের নিচে। এমনকি ভারতের ৩.৭ শতাংশ হারের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে।
বাংলাদেশের বীমা খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রাহকের দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, ১৬ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকার বীমা দাবির বিপরীতে কোম্পানিগুলো মাত্র ৯ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে পেরেছে। সামগ্রিক দাবি নিষ্পত্তির হার বর্তমানে ৫৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বৈশ্বিক মানদণ্ড ৯৮ শতাংশের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। লাইফ বীমায় এই হার ৬৫ শতাংশ এবং সাধারণ বীমায় মাত্র ৩২ শতাংশ। এর ফলে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে এবং ২০২৫ সালের শেষ দিকে পলিসি বাতিলের হার প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বীমা খাতের প্রসার ঘটাতে ২০১৮ সালে প্রায় ৯২৫ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। প্রকল্প শুরুর সময় বীমাগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৩৬ লাখ, যা ২ কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের শেষে এই সংখ্যা কমে ৮২ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্প চলাকালেই বীমা খাতের পরিধি প্রায় ৪০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরামর্শ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে বীমা খাতে কয়েকটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে:
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা বৃদ্ধি: বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে (আইডিআরএ) আরও শক্তিশালী করতে ২০১০ সালের আইন সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে অদক্ষ ও সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠন বা একীভূত করার ক্ষমতা প্রদান করা হবে।
বিনিয়োগ বৈচিত্র্যকরণ: বর্তমানে তহবিলের অন্তত ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক থাকলেও, ভবিষ্যতে এই বিনিয়োগ কাঠামোকে আরও লাভজনক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ডিজিটালাইজেশন: দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা আনতে অনলাইন তথ্যভাণ্ডার এবং কেন্দ্রীয় তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
নতুন বীমা পণ্যের প্রসার: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় কৃষি বীমা এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য বীমা বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
পরিশেষে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বীমা খাতের সংস্কার সম্পন্ন হলে এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখতে সক্ষম হবে। তবে এর জন্য গ্রাহক সেবার উন্নয়ন এবং দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা অপরিহার্য।
মন্তব্য