সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়োগ ও আইনি জটিলতা

দীর্ঘদিন স্থবির থাকার পর দেশের বৃহত্তম পরিশোধিত মূলধনী প্রতিষ্ঠান ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর কার্যক্রম পুনরায় সচল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকার বর্তমানে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের লক্ষ্যে যোগ্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছে। তবে ব্যাংক রেজোলিউশন আইন ২০২৬-এর একটি বিশেষ সংশোধনী এবং এর ফলে প্রাক্তন শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

একীভূতকরণ প্রক্রিয়া ও বর্তমান মূলধন কাঠামো

গত বছর তীব্র তারল্য সংকটে পড়া পাঁচটি শরীয়াহ-ভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো—সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। একীভূতকরণের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট সম্পদ মূল্য ‘শূন্য’ ঘোষণা করে এগুলোকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি মজবুত করতে সরকার ও বিভিন্ন তহবিল থেকে বিশাল অংকের মূলধন জোগান দেওয়া হয়েছে। এই বিনিয়োগের বিন্যাস নিচে তুলে ধরা হলো:

খাতের বিবরণঅর্থের পরিমাণ (বিলিয়ন টাকা)বর্তমান অবস্থা
সরকারি বিনিয়োগ (নগদ)১০০কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলতি হিসাবে জমা
সরকারি বিনিয়োগ (সুকুক বন্ড)১০০বিনিয়োগকৃত
আমানত বীমা তহবিল১৫০প্রত্যাশিত জোগান
মোট পরিশোধিত মূলধন৩৫০সর্বমোট মূলধন ভিত্তি

ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের অগ্রগতি

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য একজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালক খুঁজে বের করার কাজ শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, গত বৃহস্পতিবার এবং রবিবার—এই দুই দিনে মোট ১০ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত তালিকায় মোট কতজন প্রার্থী রয়েছেন, সে বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

বিতর্কিত আইন ও মালিকানা হস্তান্তরের ঝুঁকি

২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজোলিউশন আইন’-এর ১৮(ক) ধারাটি বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই সংশোধিত আইন অনুযায়ী, কোনো একীভূত ব্যাংকের প্রাক্তন শেয়ারহোল্ডাররা কিছু নির্দিষ্ট শর্তে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন।

সংশোধিত আইনের প্রধান শর্তসমূহ:

  • প্রাথমিক পরিশোধ: প্রাক্তন মালিকদের সরকার কর্তৃক বিনিয়োগকৃত তহবিলের মাত্র ৭.৫ শতাংশ অর্থ প্রথমে পরিশোধ করতে হবে।

  • বাকি অর্থ পরিশোধ: অবশিষ্ট ৯২.৫ শতাংশ অর্থ আগামী দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

  • সুদের হার: বকেয়া অর্থের ওপর বার্ষিক ১০ শতাংশ হারে সরল সুদ প্রযোজ্য হবে।

ইতিমধ্যেই সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রাক্তন শেয়ারহোল্ডাররা এই আইনের অধীনে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে আবেদন করেছেন। সমালোচকদের মতে, এই আইনটি আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাতের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পুনরায় মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার পথ প্রশস্ত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার প্রতিক্রিয়া

আর্থিক খাতের এই নীতিগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শে আর্থিক সংস্কারের অংশ হিসেবে যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, বর্তমান সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত তার পরিপন্থী বলে মনে করা হচ্ছে।

সূত্র অনুযায়ী, আইএমএফ-এর ৫.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত ১.৩ বিলিয়ন ডলারের দুটি কিস্তি ছাড় করতে বিলম্ব হওয়ার পেছনে এই মালিকানা সংক্রান্ত বিতর্ক একটি অন্যতম কারণ। ব্যাংক লুটের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের হাতে পুনরায় মালিকানা হস্তান্তর করার পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। দীর্ঘ দুই মাসের অচলাবস্থার পর নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হওয়া ইতিবাচক হলেও, মালিকানা বিতর্কের আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।