বাংলাদেশের বীমা খাত বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)–সমর্থিত ঋণ কর্মসূচি ও সংস্কার রোডম্যাপের আওতায় কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতের পাশাপাশি বীমা খাতেও সুশাসন, স্বচ্ছতা, গ্রাহকসেবা, দাবি নিষ্পত্তি এবং বিনিয়োগ নীতিমালায় সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খাতটিতে দীর্ঘসূত্রিতা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কম বীমা প্রবেশাধিকার এবং গ্রাহক আস্থার ঘাটতি—এগুলো প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
IMF-এর ইসিএফ (Extended Credit Facility), ইএফএফ (Extended Fund Facility) এবং আরএসএফ (Resilience and Sustainability Facility) কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের আর্থিক খাত সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত IMF-এর একটি মিশন বাংলাদেশে সফর করে ২০২৫ সালের Article IV Consultation এবং চলমান কর্মসূচির পঞ্চম পর্যালোচনা নিয়ে আলোচনা করে। ২০২৫ সালের জুনে সংস্থাটি বাংলাদেশের জন্য মোট সহায়তা ইসিএফ ও ইএফএফ মিলিয়ে প্রায় ৪.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং আরএসএফ-এর আওতায় প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা জানায়।
বাংলাদেশের বীমা খাত অর্থনীতিতে তুলনামূলকভাবে খুবই সীমিত অবদান রাখছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট প্রিমিয়াম আয় দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে জীবন বীমা খাতে ১২ হাজার ৪২ কোটি টাকা এবং সাধারণ বীমা খাতে ৬ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা। একই সময়ে লাইফ ফান্ডের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। তবে বীমা প্রবেশাধিকার (penetration rate) জিডিপির মাত্র ০.৩৩ শতাংশ থেকে ০.৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত।
বীমা খাতের প্রধান সূচকসমূহ
| সূচক | বাংলাদেশ | ভারত | ভিয়েতনাম | OECD গড় | লুক্সেমবার্গ |
|---|---|---|---|---|---|
| বীমা পেনিট্রেশন | 0.33–0.40% | 3.7% | 2.3–2.8% | 6.2% | ~33% |
| মোট প্রিমিয়াম | 18,534 কোটি টাকা | — | — | — | — |
দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও খাতটি পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালে মোট ১৬ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকার দাবির বিপরীতে ৯ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়, ফলে গড় নিষ্পত্তির হার দাঁড়ায় প্রায় ৫৭ শতাংশ। জীবন বীমায় এই হার ৭২ শতাংশ থেকে কমে ৬৫ শতাংশে এবং সাধারণ বীমায় ৪১ শতাংশ থেকে কমে ৩২ শতাংশে নেমেছে। বৈশ্বিক মান অনুযায়ী যেখানে দাবি নিষ্পত্তির হার ৯৭–৯৮ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের ব্যবধান উল্লেখযোগ্য।
| খাত | দাবি নিষ্পত্তির হার (পূর্বে) | বর্তমান হার |
|---|---|---|
| জীবন বীমা | 72% | 65% |
| সাধারণ বীমা | 41% | 32% |
| সামগ্রিক | — | 57% |
২০১৮ সালে চালু হওয়া ৯২৫ কোটি টাকার “বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট”-এর লক্ষ্য ছিল বীমাগ্রহীতার সংখ্যা ১ কোটি ৩৬ লাখ থেকে ২ কোটিতে উন্নীত করা। তবে ২০২৪ সালের শেষে এই সংখ্যা কমে ৮২ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়ায়। একই সময়ে পেনিট্রেশন হারও ০.৫৫ শতাংশ থেকে ০.৩৬ শতাংশে নেমে আসে।
খাত সংস্কারের আলোচনায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA)–কে শক্তিশালী করার প্রস্তাব রয়েছে। বীমা আইন ২০১০ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে দুর্বল কোম্পানির বোর্ড পরিবর্তন, একীভূতকরণ এবং কঠোর তদারকির ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় বিবেচনায় আছে।
এছাড়া মূলধন ও সলভেন্সি মার্জিন নিশ্চিতকরণ, ঝুঁকিভিত্তিক বিনিয়োগ কাঠামো প্রবর্তন, ডিজিটাল দাবি নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ এবং কৃষি ও স্বাস্থ্য বীমা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি সিকিউরিটিজে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগ কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৫ অর্থবছরে ৩.৭ শতাংশে নেমে আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৪.২ শতাংশ। তবে আর্থিক খাত সংস্কার কার্যকর হলে ২০২৬–২৭ সালে প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, বীমা খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে চলমান সংস্কার কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনাই প্রধান লক্ষ্য।
