ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টার কিছু পরে রাজ্যপাল আর এন রবি তাঁকে পদের শপথবাক্য পাঠ করান। এই শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকার গঠিত হলো।
Table of Contents
শপথ গ্রহণ ও মন্ত্রিসভার গঠন
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শপথ গ্রহণের পরপরই তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে আরও পাঁচজন বিধায়ক শপথ গ্রহণ করেন। নবনির্বাচিত এই মন্ত্রীরা হলেন—দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক এবং ক্ষুদিরাম টুডু। এই পাঁচজন মন্ত্রীর মধ্যে ক্ষুদিরাম টুডু সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেন, যা অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য যোগ করে। মুখ্যমন্ত্রীসহ বাকি সকল সদস্য বাংলা ভাষায় শপথবাক্য পাঠ করেন। তবে বর্তমানে নবনিযুক্ত এই মন্ত্রীদের কার অধীনে কোন দপ্তর থাকবে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো প্রদান করা হয়নি।
নিচে নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের নির্বাচনি এলাকা ও রাজনৈতিক পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করা হলো:
| নাম | পদবি | নির্বাচনি কেন্দ্র | বিশেষ তথ্য |
| শুভেন্দু অধিকারী | মুখ্যমন্ত্রী | ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম | দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছেন। |
| দিলীপ ঘোষ | মন্ত্রী | খড়্গপুর সদর | বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি। |
| অগ্নিমিত্রা পাল | মন্ত্রী | আসানসোল দক্ষিণ | বিশিষ্ট ফ্যাশন ডিজাইনার ও বিধায়ক। |
| অশোক কীর্তনিয়া | মন্ত্রী | বনগাঁ উত্তর | মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী নেতা। |
| নিশীথ প্রামাণিক | মন্ত্রী | মাথাভাঙা (কোচবিহার) | প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী। |
| ক্ষুদিরাম টুডু | মন্ত্রী | রানিবাঁধ (বাঁকুড়া) | সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করেছেন। |
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি ও আভিজাত্যপূর্ণ আয়োজন
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এছাড়া কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন, রাজনাথ সিং, শিবরাজ সিং চৌহান এবং জেপি নাড্ডার মতো হেভিওয়েট নেতারা মঞ্চে উপস্থিত থেকে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হন।
অন্যান্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ, আসামের হিমন্ত বিশ্বশর্মা, ত্রিপুরার মানিক সাহা এবং উত্তরাখণ্ডের পুষ্কর সিং ধামিসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীর উপস্থিতি ছিল অন্যতম আকর্ষণ।
সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ও রবীন্দ্রজয়ন্তী
এদিনটি ছিল পঁচিশে বৈশাখ তথা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী। তাই পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে ছিল বাঙালি সংস্কৃতির গভীর ছাপ। অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কবিগুরুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান। অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে সারা দিন ধরে রবীন্দ্রসংগীত বাজানো হয়। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিল্পীরা আদিবাসী নৃত্য, ছৌ নাচ ও রায়বেশি নাচের মাধ্যমে গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরেন। আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি যেমন রসগোল্লা, লাড্ডু ও দইয়ের পাশাপাশি ঝালমুড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর এই ক্ষমতার রদবদল ঘটল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্থলাভিষিক্ত হওয়া শুভেন্দু অধিকারী একসময় তাঁরই ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। বর্তমানে তিনি রাজ্য বিজেপির পরিষদীয় দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এই শীর্ষ পদে আসীন হলেন। রাজ্যের সব জেলা থেকে আসা অগণিত বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিতে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড আজ এক উৎসবমুখর জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।
