উত্তরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা টিএমএসএস এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই প্রতিষ্ঠানটি এবার থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড ‘টিএমএসএস থ্যালাসেমিয়া ক্লিনিক’ চালু করেছে।
শনিবার (৯ মে, ২০২৬) বগুড়ার ঠেঙ্গামারায় অবস্থিত টিএমএসএস ক্যান্সার সেন্টারের ১১তম তলায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশেষায়িত ক্লিনিকের উদ্বোধন করা হয়। ক্লিনিকটি উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে উত্তরাঞ্চলের থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘদিনের চিকিৎসাসেবার সংকট নিরসনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।
Table of Contents
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম
ক্লিনিকের শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কর্মসূচির মধ্যে ছিল বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনাসভা এবং সচেতনতামূলক স্বাস্থ্য ক্যাম্পেইন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন টিএমএসএস পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে টিএমএসএস হেমাটোলজি অ্যান্ড বিএমটি সেন্টারের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. খাজা আমিররুল ইসলাম থ্যালাসেমিয়া রোগের ভয়াবহতা নিয়ে আলোকপাত করেন। তিনি জানান যে, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তজনিত রোগ। বাংলাদেশে সচেতনতার অভাব এবং বিবাহের পূর্বে রক্ত পরীক্ষা না করার কারণে প্রতি বছর থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। সঠিক স্ক্রিনিং ও সচেতনতাই পারে এই রোগ প্রতিরোধ করতে।
ক্লিনিকে প্রদত্ত সেবাসমূহ ও লক্ষ্য
টিএমএসএসের উপ-নির্বাহী পরিচালক রোটা. ডা. মো. মতিউর রহমান জানান, এই ক্লিনিকে রোগীদের জন্য সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বর্তমানে ক্লিনিকটিতে যে সকল সেবা পাওয়া যাবে তা নিচের টেবিলে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
টেবিল: টিএমএসএস থ্যালাসেমিয়া ক্লিনিকে প্রাপ্ত সেবাসমূহ
| সেবার ধরন | বিস্তারিত বিবরণ |
| স্ক্রিনিং ও পরীক্ষা | এইচবি ইলেকট্রোফোরোসিস ও থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং। |
| রক্তের গ্রুপ নির্ণয় | রক্ত সঞ্চালনের জন্য সঠিক গ্রুপ শনাক্তকরণ। |
| বিশেষজ্ঞ পরামর্শ | অভিজ্ঞ হেমাটোলজিস্ট ও চিকিৎসকদের নিয়মিত পরামর্শ। |
| কাউন্সেলিং | রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য জেনেটিক ও মানসিক কাউন্সেলিং। |
| ফলোআপ | নিয়মিত বিরতিতে শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা। |
| জনসচেতনতা | থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে জনশিক্ষা ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম। |
ডা. মতিউর রহমান আরও উল্লেখ করেন যে, ভবিষ্যতে এই ক্লিনিকে আরও আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা বাড়ানো হবে। বিশেষ করে রোগীদের জন্য রক্ত সঞ্চালন (Blood Transfusion) প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও নিরাপদ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
টিএমএসএস-এর চিকিৎসা অবকাঠামো ও সক্ষমতা
টিএমএসএস দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার এক বিশাল হাব তৈরি করেছে। থ্যালাসেমিয়া ক্লিনিকটি মূলত তাদের বিদ্যমান বৃহৎ চিকিৎসা কমপ্লেক্সের একটি অংশ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি এই অঞ্চলে বেশ কিছু বৃহৎ স্বাস্থ্য অবকাঠামো পরিচালনা করছে:
টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতউল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল: ১,০০০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালে আধুনিক সকল সাধারণ ও জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়।
বিশেষায়িত হার্ট সেন্টার: ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই সেন্টারে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসা ও সার্জারির সুবিধা রয়েছে।
ক্যান্সার হাসপাতাল: ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালে ক্যান্সারের স্ক্রিনিং, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়।
অক্সিজেন প্ল্যান্ট: হাসপাতাল এলাকায় তিনটি বড় মেডিকেল অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে, যা থেকে প্রতি ঘণ্টায় ১ লক্ষ ৯ হাজার লিটার অক্সিজেন উৎপাদিত হয়। এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা জরুরি চিকিৎসায় অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন টিএমএসএস পরিচালনা পর্ষদের উপদেষ্টা আয়েশা বেগম, নির্বাহী কর্মকর্তা গৌতম কুমার, টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন এবং বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. শামসুল আলম পাশা।
এছাড়াও সরকারি মজিবর রহমান ভান্ডারী মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আব্দুস ছাবুর খন্দকার এবং করতোয়া মাল্টিমিডিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ অসিত কুমার সরকারসহ স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী, সমাজসেবক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন যে, টিএমএসএস থ্যালাসেমিয়া ক্লিনিকটি উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত রক্ত নিতে হয় এবং আয়রন চিলেশন থেরাপির প্রয়োজন হয়। একটি নির্দিষ্ট ক্লিনিকে এই সেবাগুলো একই ছাদের নিচে পাওয়া গেলে রোগীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে। টিএমএসএসের এই উদ্যোগটি সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে স্বাস্থ্য খাতে বড় অবদান হিসেবে বিবেচিত হবে।
