উপমহাদেশের সঙ্গীতভুবনে যে ক’জন শিল্পী তাঁদের অনন্য কণ্ঠমাধুর্যে শ্রোতার হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তালাত মাহমুদ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর মসৃণ, কোমল, আবেগঘন কণ্ঠ যেন এক অনির্বচনীয় মায়াজাল—যা আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের মুগ্ধ করে রাখে।
১৯২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, ভারতের লক্ষ্ণৌ শহরের এক সম্ভ্রান্ত কিন্তু রক্ষণশীল পরিবারে তাঁর জন্ম। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি প্রবল অনুরাগ থাকলেও পারিবারিক বাধা ছিল প্রবল। একসময় এমন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়—পরিবার, না কি সঙ্গীত? তিনি বেছে নেন সঙ্গীতকে। সময়ের সঙ্গে সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে এনে দেয় অমর খ্যাতি; আর দীর্ঘ এক যুগ পর পরিবারও মেনে নেয় তাঁর এই পথচলা।
মাত্র ১৬ বছর বয়সেই গজল গেয়ে আলোড়ন তোলেন তিনি। দাগ, জিগর, মির প্রমুখ কবিদের গজলে তাঁর কণ্ঠ যেন নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গীতজীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে এইচএমভি তাঁকে চুক্তিবদ্ধ করে এবং ১৯৪১ সালে রেকর্ড হয় তাঁর বিখ্যাত গজল—“সব দিন এক সমান নাহি থা”। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর খ্যাতির বিস্তার।
১৯৪৪ সালে প্রকাশিত “তাসভির তেরি দিল মেরা বেহলা না সাকেগি” তাঁকে উপমহাদেশজুড়ে এনে দেয় অসাধারণ জনপ্রিয়তা। লক্ষ্ণৌ থেকে কলকাতা—আর সেখান থেকে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে তাঁর কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ে ভালোবাসার আবেশে।
গজলের জগতে ‘গজল সম্রাট’ খেতাব পাওয়া এই শিল্পী বাংলা গানেও ছিলেন সমান পারদর্শী।
“তোমারে লেগেছে এত যে ভালো”,
“তুমি সুন্দর যদি নাহি হও”,
“আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙে যায়”,
“শোনো গো সোনার মেয়ে”—
এমন অসংখ্য কালজয়ী গানে তিনি জয় করেছেন কোটি হৃদয়।
১৯৬০ সালে তিনি ঢাকায় আসেন এবং রাজধানীর বুকে চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেন—যা আজও স্মরণীয়। তাঁর কণ্ঠ শুধু গান নয়, এক অনুভূতির নাম—যেখানে ভালোবাসা, বেদনা আর নরম আবেগ একাকার হয়ে যায়।
বাংলা আধুনিক, গজল, নজরুলগীতি, হামদ-নাতসহ নানা ধারার গানে তাঁর বিচরণ ছিল অনবদ্য। ভারত সরকার তাঁকে একাধিক রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করে, যা তাঁর শিল্পীজীবনের স্বীকৃতি বহন করে।
১৯৯৮ সালের ৯ মে, এই সুরের জাদুকর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ, তাঁর গান—আজও বেঁচে আছে, প্রতিটি সুরে, প্রতিটি স্মৃতিতে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, প্রিয় শিল্পী।
আপনার সুর কখনো মুছে যাবে না—হৃদয়ের গভীরে বাজতেই থাকবে…
