শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সম্মুখসারির বীর যোদ্ধা, একই সঙ্গে একজন শিক্ষাবিদ ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী নেতা। তাঁর জীবন ছিল দেশপ্রেম, ত্যাগ এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত।
১৯৫০ সালের ৯ নভেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০০৪ সালের ৭ মে মৃত্যুবরণ করেন। জীবদ্দশায় তিনি মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। দাঙ্গাবাজার, টঙ্গী টিএসসি, ছয়দানা এবং কাশিমপুরসহ বিভিন্ন স্থানে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। একাধিক ঘটনায় তিনি শত্রু বাহিনীর ঘেরাও থেকে স্টেনগান হাতে নদী বা খালে ঝাঁপ দিয়ে কৌশলগতভাবে নিজেকে রক্ষা করেন এবং পাল্টা আক্রমণ পরিচালনা করেন। আরেকটি যুদ্ধে বেয়নেট আক্রমণে আহত হলেও তিনি যুদ্ধ ত্যাগ করেননি এবং পুনরায় লড়াইয়ে অংশ নেন।
মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনার সমন্বয়ে তিনি ছাত্রদের মধ্যে দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।
তিনি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন। শ্রমিকদের মামলার সহায়তার জন্য তহবিল গঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
গাজীপুর অঞ্চলে তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে পুবাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনি গাজীপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং জনগণের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত আচরণে শৃঙ্খলা ও আত্মমর্যাদাবোধ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতো। জাপান সফরের সময় শ্রমিক নেতাদের পক্ষ থেকে দেওয়া উপহার তিনি গ্রহণ না করে জাপানের একটি জাদুঘরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংরক্ষণের অনুরোধ জানান—যা তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও শ্রদ্ধাবোধের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
নিচে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়সমূহ সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ৯ নভেম্বর ১৯৫০ |
| মৃত্যু | ৭ মে ২০০৪ |
| শিক্ষাগত যোগ্যতা | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (১৯৭০) |
| পেশা | শিক্ষকতা, রাজনীতি |
| মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা | সম্মুখসারির বীর যোদ্ধা |
| শ্রমিক রাজনীতি | জাতীয় শ্রমিক লীগের নেতা |
| নির্বাচিত পদ | ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য |
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে শুরু করে শিক্ষা, শ্রমিক আন্দোলন এবং জাতীয় রাজনীতিতে শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।