ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সমর্থন চেয়েছেন ‘তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম’ (টিভিকে) দলের প্রতিষ্ঠাতা ও দক্ষিণী চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা থালাপতি বিজয়। ২০২৬ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ নেতা কেসি বেণুগোপাল গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বিজয়ের এই পদক্ষেপের ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তামিল রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারকারী দ্রাবিড় দলগুলোর সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
Table of Contents
কংগ্রেসের অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ কৌশল
কেসি বেণুগোপাল জানান, তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষে আগামীকাল বুধবার সকালে চেন্নাইয়ে কংগ্রেসের রাজ্য শাখার একটি বিশেষ বর্ধিত সভা আহ্বান করা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, রাজ্যের সচেতন জনগণ একটি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে কংগ্রেস কোনোভাবেই ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সমর্থিত কোনো রাজনৈতিক সমীকরণকে সমর্থন করবে না।
কংগ্রেসের নির্ভরযোগ্য সূত্রসমূহ ইঙ্গিত দিয়েছে যে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিজয়ের দলকে সমর্থন প্রদানের বিষয়ে নীতিগতভাবে ইতিবাচক। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা রাজ্য ইউনিটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তামিলনাড়ু কংগ্রেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা গিরিশ চোড়ঙ্কর জানিয়েছেন, থালাপতি বিজয় ইতিপূর্বে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের নিকট একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে সমর্থনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
বিধানসভার সমীকরণ ও নির্বাচনী ফলাফল
তামিলনাড়ু বিধানসভার মোট ২৩৪টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য ম্যাজিক ফিগার বা প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হলো ১১৮টি আসন। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, বিজয়ের দল টিভিকে ১০৮টি আসনে জয়লাভ করে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও তারা এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে ১০টি আসন পিছিয়ে রয়েছে, তবুও কংগ্রেসের সমর্থন পেলে বিজয়ের জন্য সরকার গঠনের পথ নিষ্কণ্টক হবে।
নির্বাচনী বিশ্লেষণে গিরিশ চোড়ঙ্কর উল্লেখ করেছেন যে, এবারের নির্বাচনে তামিলনাড়ুর তরুণ সমাজ ও নারী ভোটারদের মধ্যে বিজয়ের পক্ষে একটি বিশাল গণজোয়ার পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে বিজয়ের নতুন ধারার প্রচারণায় ভোটাররা ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছেন, যার প্রতিফলন ঘটেছে ব্যালট বাক্সে। বিজয়ের এই উত্থানকে তামিল রাজনীতির ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও বিজয়ের প্রথম বিবৃতি
নির্বাচনী জয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক আবেগঘন বিবৃতিতে বিজয় তার সমর্থকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, দলের রাজনৈতিক যাত্রার শুরুতে অসংখ্য সমালোচনা, উপহাস ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু তামিলনাড়ুর মানুষ প্রতিকূল সময়ে মায়ের মতো তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং বিপুল জনসমর্থন দিয়ে দলের অবস্থান সুসংহত করেছেন।
বিজয় আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি জনগণের রায়কে বিনম্র চিত্তে গ্রহণ করেছেন এবং তামিলনাড়ুর সামগ্রিক উন্নয়নে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা উপহার দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। বিধানসভার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, রাজ্যপালের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের দাবি উত্থাপন করার পর এবং প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত হলে বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
তামিলনাড়ুর রাজনীতি কয়েক দশক ধরে ডিএমকে (DMK) এবং এআইএডিএমকে (AIADMK) নামক দুটি দ্রাবিড় দলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। থালাপতি বিজয়ের এই অভাবনীয় সাফল্য সেই দ্বিদলীয় আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে বিজেপি বিরোধী অবস্থানে থেকেও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজয়ের ১০৮টি আসনে জয়লাভ করাকে ভারতের জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কংগ্রেসের সমর্থন প্রাপ্তি সাপেক্ষে বিজয়ের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে তা তামিলনাড়ুর উন্নয়ন এবং কেন্দ্রীয় রাজনীতির সাথে রাজ্যের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বুধবারের বৈঠকে কংগ্রেসের রাজ্য ইউনিট কী সিদ্ধান্ত নেয়, এখন তার ওপরই নির্ভর করছে দক্ষিণ ভারতের এই শক্তিশালী রাজ্যের ভবিষ্যৎ শাসন ক্ষমতা। বিজয় শিবির আশা করছে, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জনকল্যাণের অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কংগ্রেস তাদের পাশে দাঁড়াবে এবং শীঘ্রই চেন্নাইয়ের ফোর্ট সেন্ট জর্জে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেবে।
