সরকারি তিতুমীর কলেজে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে নারী শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত সরকারি তিতুমীর কলেজে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। ২০২৬ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার রাতে কলেজের ছাত্রীনিবাসের আবাসিক শিক্ষার্থীরা হল থেকে বেরিয়ে এসে প্রশাসনিক ভবনের সামনে ও হলের প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং ছাত্রদলের নতুন কমিটিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই গণবিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটে।

বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট ও মূল কারণ

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য এবং স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, সম্প্রতি সরকারি তিতুমীর কলেজের আবাসিক হলগুলোতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করার লক্ষ্যে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে নতুন একটি কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটিকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। অভিযোগ উঠেছে, নতুন কমিটির নেতৃবৃন্দ হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছিলেন।

বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে জানা যায়, ছাত্রদলের ওই নতুন কমিটির কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় বা বিরুদ্ধাচরণ করায় কলেজের ৩ জন সাধারণ শিক্ষার্থীকে হল থেকে বহিষ্কারের একটি খবর বা ‘গুঞ্জন’ ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আবাসিক হলের নারী শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে হলের গেট খুলে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তাদের দাবি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সকল প্রকার রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করতে হবে।

স্লোগান ও বিক্ষোভের দৃশ্য

মঙ্গলবার রাত বাড়ার সাথে সাথে বিক্ষোভের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। নারী শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে এসময় শোনা যায় বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগান। তারা চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘হল কারো বাপের না, ছাত্ররাজনীতি চলবে না’, ‘লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি, তিতুমীরে চলবে না’। এছাড়াও কলেজ প্রশাসনের নিরব ভূমিকার সমালোচনা করে তারা স্লোগান দেন, ‘প্রশাসনের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’।

বিক্ষোভকারীরা জানান, আবাসিক হলে সিট দখল, মিছিলে যেতে বাধ্য করা এবং রাজনৈতিক নেতাদের খবরদারি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। ছাত্রদলের সাম্প্রতিক কমিটি গঠনের পর থেকে এই আতঙ্ক আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘক্ষণ অবস্থানের কারণে কলেজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

বহিষ্কারের গুঞ্জন ও প্রশাসনিক নিরবতা

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রধান ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তিন শিক্ষার্থীর কথিত বহিষ্কারের বিষয়টি। যদিও কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বহিষ্কারাদেশের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা হয়নি, তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বিশ্বাস প্রবল যে—ভিতর থেকে রাজনৈতিক চাপে তাদের সহপাঠীদের হয়রানি করা হচ্ছে। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কতিপয় শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামতকে দমন করার চেষ্টা করছে।

কলেজ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে কলেজের নিরাপত্তা কর্মীরা হলের গেটে অবস্থান নেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা দাবি তুলেছেন যে, বহিষ্কারের হুমকি বা গুঞ্জন অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে এবং তিতুমীর কলেজ ক্যাম্পাসকে সকল প্রকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত ঘোষণা করতে হবে।

ছাত্রদলের অবস্থান ও রাজনৈতিক মেরুকরণ

ছাত্রদলের ঘোষিত নতুন কমিটি নিয়ে কলেজের একটি বড় অংশ ক্ষুব্ধ থাকলেও সংগঠনের পক্ষ থেকে এই বিক্ষোভকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে অভিহিত করা হয়নি। তবে তারা শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ‘ছাত্ররাজনীতি’ নামক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

জননিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা

মহাখালী এলাকায় অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাতের বেলা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ আশেপাশের এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এবং ক্যাম্পাসে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা এই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তারা কলেজ অধ্যক্ষের মাধ্যমে একটি স্থায়ী নির্দেশনা দাবি করেছেন যেন ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন হলের শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত বা একাডেমিক জীবনে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, গভীর রাত পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিলেন। পরিস্থিতি শান্ত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় এবং নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি সম্মানজনক সমাধান জরুরি। ৫ মে-র এই বিক্ষোভ সরকারি তিতুমীর কলেজের ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতি বিরোধী আন্দোলনের একটি অন্যতম বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।