উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র সংঘাত: সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘হালিম গ্রুপ’-এর প্রধান আব্দুল হালিম নিহত

কক্সবাজারের উখিয়ায় অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরের অভ্যন্তরে অপরাধ জগতের আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে আব্দুল হালিম নামক এক রোহিঙ্গা নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহত আব্দুল হালিম রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয় একটি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘হালিম গ্রুপ’-এর প্রধান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২৬ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং ৮/ইস্ট ব্লকের ‘লাল ব্রিজ’ সংলগ্ন এলাকায় এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ

ক্যাম্পের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতে আব্দুল হালিম তার কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে ৮/ইস্ট ব্লকের লাল ব্রিজ এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় আগে থেকে ওত পেতে থাকা একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাদের পথরোধ করে এবং আব্দুল হালিমকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কাছ থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এবং সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সন্ত্রাসীরা আব্দুল হালিমের শরীরে একাধিক গুলি নিশ্চিত করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায়। গুলির আঘাতে আব্দুল হালিম রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয় রোহিঙ্গারা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তাকে উদ্ধার করে নিকটস্থ এমএসএফ (মেডিসিন সানস ফ্রন্টিয়ার্স) হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় আব্দুল হালিমের আরও একজন সহযোগী গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে তার পরিচয় এখনও প্রকাশ করা হয়নি এবং তিনি গোপন স্থানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধের নেপথ্য

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কুতুপালং ও তৎসংলগ্ন ক্যাম্পগুলোতে আধিপত্য বিস্তার, অবৈধ মাদকের বাণিজ্য (ইয়াবা), মানব পাচার এবং নিয়মিত চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে শীতল যুদ্ধ চলছিল। নিহত আব্দুল হালিমের নেতৃত্বে ‘হালিম গ্রুপ’ ক্যাম্পের একটি নির্দিষ্ট অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল।

প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষে প্রতিপক্ষ কোনো সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। নিহতের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় হত্যা, মাদক ও অস্ত্রসহ একাধিক গুরুতর ফৌজদারি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। মূলত ক্যাম্পের অভ্যন্তরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও মাদক ব্যবসার বন্টন নিয়ে বিরোধই এই সংঘাতের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও বর্তমান পরিস্থিতি

হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ক্যাম্পে নিয়োজিত ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং এলাকাটি ঘিরে ফেলেন। ১৪ এপিবিএন-এর অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) সিরাজ আমিন বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করার লক্ষে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি গ্রহণ করছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে রাতভর ক্যাম্পের বিভিন্ন ব্লকে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, ক্যাম্পে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী কোনো গ্রুপকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

ক্যাম্পের জননিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সাধারণ রোহিঙ্গারা এই হত্যাকাণ্ডের পর চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। রাতের বেলা সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের এমন প্রকাশ্য আনাগোনা এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ক্যাম্পের সামগ্রিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ক্যাম্পগুলোতে সন্ত্রাসীরা সহজেই আত্মগোপন করতে পারে, যা তাদের জন্য অপরাধ সংঘটন করা সহজ করে তোলে।

বর্তমানে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ক্যাম্পে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এবং মানবিক সহায়তার পরিবেশ বজায় রাখতে ক্যাম্পে এ ধরনের সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উখিয়া থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।