রংপুরে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ: ছুরিকাঘাতে ভ্যানচালক নিহত

রংপুরের বদরগঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এক নৃশংস হামলায় আরিফুল ইসলাম (৩০) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। ২০২৬ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে বদরগঞ্জ পৌর শহরের বালুয়াভাটা মোড় এলাকায় এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত আরিফুল ইসলাম পৌর শহরের পাঠানপাড়া এলাকার রেজাউল ইসলামের ছেলে এবং পেশায় একজন ভ্যানচালক ছিলেন। এই ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কিশোর গ্যাংয়ের অন্যতম সদস্য জামাল হোসেনকে (২২) আটক করতে সক্ষম হয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আদালত চত্বরে সংঘাত

বদরগঞ্জ থানা পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্যমতে, এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে মঙ্গলবার সকালে রংপুর আদালত চত্বরে। একটি মামলার হাজিরা দিতে কিশোর গ্যাংয়ের একটি পক্ষের মমিনুল ইসলামসহ ৫ জন আদালতে উপস্থিত হন। একই মামলায় হাজিরা দিতে আসেন প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাং লিডার ফিরোজ শাহ ওরফে ‘মার্ডার ফিরোজ’ এবং তার অনুসারীরা।

আদালত প্রাঙ্গণেই দুই গ্রুপের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে মার্ডার ফিরোজের লোকজন মমিনুলের গ্রুপের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে মমিনুলের নাক ফেটে যায় এবং রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মমিনুলের পক্ষের লোকজন বাধা দিতে গেলে আরও অন্তত দুইজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে মার্ডার ফিরোজ নিজেই একপর্যায়ে লোকদেখানো মীমাংসা করে দেন এবং গ্রুপ দুটি আদালত চত্বর ত্যাগ করে।

বদরগঞ্জে প্রতিশোধের উন্মাদনা

আদালত থেকে বদরগঞ্জে ফিরে মমিনুলের পক্ষ প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে। তারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পৌর শহরের বিভিন্ন স্থানে ফিরোজ বাহিনীকে খুঁজতে থাকে। মমিনুল ও তার সহযোগীরা ফিরোজের গ্রুপের সদস্যদের সরাসরি খুঁজে না পেয়ে একপর্যায়ে মার্ডার ফিরোজের বাড়িতে হামলা চালায়। এই সংবাদ ফিরোজের কানে পৌঁছালে পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং ফিরোজ বাহিনী মমিনুলের লোকজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করে।

হত্যাকাণ্ড ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ

বিকেল ৪টার দিকে পৌর শহরের বালুয়াভাটা মোড় এলাকায় ফিরোজের গ্রুপ মমিনুলের অনুসারীদের সন্ধান করার সময় ভ্যানচালক আরিফুল ইসলামের মুখোমুখি হয়। আরিফুল ইসলাম মমিনুলের পাড়ার (পাঠানপাড়া) বাসিন্দা এবং তাদের পূর্বপরিচিত হওয়ায় ফিরোজ বাহিনী তাকে লক্ষ্যবস্তু করে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মার্ডার ফিরোজসহ তার গ্রুপের সদস্যরা আরিফুলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করা হয়।

রক্তাক্ত অবস্থায় আরিফুল মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক যাদোন্দ্রো নাথ শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আরিফুলকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকের মতে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

স্বজনদের আহাজারি ও পুলিশের ভূমিকা

নিহত আরিফুল ইসলামের বাবা রেজাউল ইসলাম শোকাতুর কণ্ঠে জানান, তার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং শ্রমজীবী একজন মানুষ ছিলেন। তিনি বলেন, “আমার ছেলে ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। আম্বিয়ার মোড় এলাকায় যাওয়ার সময় হঠাৎ মার্ডার ফিরোজের গ্রুপ এসে তাকে ঘিরে ধরে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে কোপাতে থাকে। আমার ছেলের কোনো অপরাধ ছিল না। আমি এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”

বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার গণমাধ্যমকে জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। হাসপাতাল থেকে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে জামাল হোসেন নামের একজনকে আটক করা হয়েছে এবং মূল অভিযুক্ত ফিরোজ শাহসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় উদ্বেগ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি

পৌর শহরে দিনের আলোতে কিশোর গ্যাংয়ের এমন বর্বরতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ‘মার্ডার ফিরোজ’ এর মতো ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা এবং আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা জননিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কিশোর গ্যাংয়ের এই সংস্কৃতি নির্মূল করতে পুলিশকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বদরগঞ্জ থানা পুলিশ জানিয়েছে, এলাকায় পুনরায় কোনো সংঘর্ষ যেন না ঘটে, সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিহতের পরিবার এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মামলা হওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।