শ্যামপুরে নাঈম শিকদার হত্যা মামলা: মৃত আসামিসহ ৬ জনের যাবজ্জীবন

দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর রাজধানীর শ্যামপুরে বিএনপি নেতা নাঈম শিকদার বিন্দুকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে। গত রবিবার (৩ মে) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর বিচারক জাকারিয়া হোসেন এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ছয়জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের পাশাপাশি আর্থিক জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই রায়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সাজাপ্রাপ্ত ছয়জনের মধ্যে একজন ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করলেও আদালতের নথিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা প্রদান করা হয়েছে।

দণ্ডিত আসামিদের তালিকা ও সাজার বিবরণ

আদালতের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন:

  • শামীম হোসেন শিকদার

  • শহিদুল ইসলাম ওরফে ঠোঁটকাটা রিপন

  • শহীদ ওরফে ড্রাইভার শহীদ (মৃত)

  • শহিদ হোসেন ওরফে সেঞ্চু

  • দুলাল ওরফে কালা দুলাল ওরফে জাকির হোসেন

  • আমিনুল ইসলাম

সংশ্লিষ্ট আদালতের উচ্চমান বেঞ্চ সহকারী ফকির জাহিদুল ইসলাম রায়ের বিস্তারিত নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি দণ্ডিত প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আসামিদের আরও এক বছর বিনাশ্রম কারাভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার সময় একমাত্র আসামি আমিনুল ইসলাম আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাকে সাজা পরোয়ানার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক কারাগারে পাঠানো হয়। অন্যদিকে, পলাতক থাকা বাকি পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। মৃত আসামির সাজার বিষয়ে আদালত থেকে জানানো হয়, বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন কোনো আসামি মারা গেলেও অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে প্রতীকী সাজা দেওয়ার আইনি বিধান অনুসরণ করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ ও ঘটনার বিবরণ

মামলার নথিপত্র এবং প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, নাঈম শিকদার বিন্দুর সাথে দণ্ডিত আসামিদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল। বিশেষ করে তৎকালীন কমিশনার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। আসামিরা বিভিন্ন সময় নাঈমকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল।

২০০৪ সালের ১৬ নভেম্বর, পবিত্র রমজান মাসের এক সন্ধ্যায় নাঈম শিকদার শ্যামপুরের কলিমুল্লাহ বাগ বটতলা সংলগ্ন ‘গোল্ডেন হেয়ার ড্রেসার’ নামক সেলুনের সামনে অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যা আনুমানিক সোয়া ৭টার সময় ওত পেতে থাকা আসামিরা অতর্কিতে তাকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। গুরুতর আহত অবস্থায় নাঈম ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরদিন নাঈমের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বাদী হয়ে রাজধানীর কদমতলী থানায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেন।

তদন্তের দীর্ঘ পথ ও বিচারিক ধাপসমূহ

হত্যাকাণ্ডের পর কদমতলী থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও কয়েক বছরেও কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। ঘাতকদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায় মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিবি পুলিশ তদন্তে ঘটনার সত্যতা পেলেও এজাহারভুক্ত আসামিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ার অজুহাতে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিল করে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে।

বাদী সাবিনা ইয়াসমিন ডিবি পুলিশের সেই প্রতিবেদনের ওপর আদালতে ‘নারাজি’ পিটিশন দাখিল করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সিআইডি-কে (Criminal Investigation Department) অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। সিআইডির ইন্সপেক্টর মঞ্জুরুল রহমান ভূঁইয়া পুনরায় তদন্ত পরিচালনা করে ঘটনার জট খোলেন এবং ২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আসামিদের অভিযুক্ত করে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র জমা দেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ৩০ অক্টোবর আদালতের মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত মোট ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও পর্যালোচনা করে এই রায় প্রদান করেন।

আইনি নজির ও বর্তমান পরিস্থিতি

রায়ের আগে আত্মপক্ষ শুনানিতে একমাত্র উপস্থিত আসামি আমিনুল ইসলাম নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। তবে দীর্ঘ সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং সিআইডির পেশ করা তথ্যের ভিত্তিতে আদালত তাকেসহ বাকিদের দোষী সাব্যস্ত করেন। যদিও মৃত আসামি ড্রাইভার শহীদের সাজা কার্যকর করার বাস্তব সুযোগ নেই, তবে অপরাধের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সাজা দেওয়াকে একটি কঠোর আইনি বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

নিহত নাঈমের পরিবার দীর্ঘ ২২ বছর পর প্রাপ্ত এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দণ্ড কার্যকর করার জন্য এখন প্রশাসনের প্রতি দাবি জানানো হয়েছে। ঢাকার শ্যামপুর এলাকার এই আলোচিত হত্যা মামলার নিষ্পত্তি দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।