ঢাকার মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গত বছরের জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি সহিংস ঘটনায় ছাত্রদল কর্মী শেখ মোহাম্মদ আশিক গুরুতর আহত হওয়ার মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৪০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। তদন্ত শেষে পুলিশ জানিয়েছে, মূল ঘটনায় জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে এই ৪০ জনের ক্ষেত্রে। একই ঘটনায় আগে দায়ের করা মামলায় ১২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল এবং অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করা হয়।
তদন্ত অনুযায়ী, দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে ১২৭ জনের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক ফেরদৌস জামান গত ২০ এপ্রিল আদালতে এই অভিযোগপত্র জমা দেন।
মামলার বিবরণে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সকাল থেকেই মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় আন্দোলনকারীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপুরের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি হয়। বেলা আনুমানিক পৌনে তিনটার দিকে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে ছাত্রদল কর্মী শেখ মোহাম্মদ আশিক গুরুতর আহত হন এবং পরে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে ২৮ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করা হয়। এরপর তদন্ত শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ নয়; বরং কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে নির্দেশনা ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে একাধিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সমন্বিতভাবে কাজ করেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়। অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং জাহাঙ্গীর কবির নানকের নির্দেশনা ও ভূমিকার ভিত্তিতে ঘটনাস্থলের কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মী, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতারাও রয়েছেন। একই সঙ্গে তদন্তে এমন কিছু ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে পাওয়া তথ্যের একটি সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো—
| নাম | পরিচয়/পদবী | অবস্থা |
|---|---|---|
| শেখ হাসিনা | সাবেক প্রধানমন্ত্রী | অভিযুক্ত |
| ওবায়দুল কাদের | সাবেক সেতুমন্ত্রী | অভিযুক্ত |
| আসাদুজ্জামান খান কামাল | সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী | অভিযুক্ত |
| জাহাঙ্গীর কবির নানক | সাবেক মন্ত্রী | অভিযুক্ত |
| সাদেক খান | সাবেক সংসদ সদস্য | অভিযুক্ত |
| আসিফ আহমেদ | সাবেক কাউন্সিলর | অভিযুক্ত |
| তারেকুজ্জামান রাজীব | রাজনৈতিক কর্মী | অভিযুক্ত |
| নাঈমুল হাসান রাসেল | ছাত্র সংগঠন নেতা | অভিযুক্ত |
| কামরুল হোসেন | স্থানীয় ব্যক্তি | অব্যাহতি সুপারিশ |
| ওয়াহিদ হাসান | স্থানীয় ব্যক্তি | অব্যাহতি সুপারিশ |
| আক্কাছ সওদাগর | স্থানীয় ব্যক্তি | অব্যাহতি সুপারিশ |
| মোর্শেদুল আলম চৌধুরী (তাজু) | স্থানীয় ব্যক্তি | অব্যাহতি সুপারিশ |
তদন্ত কর্মকর্তা ফেরদৌস জামান জানান, ঘটনাস্থলে অনেক অভিযুক্ত ব্যক্তির উপস্থিতি বা সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক তথ্য ও সাক্ষ্য পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এখন মামলাটি আদালতের পরবর্তী প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে। অভিযোগপত্র গ্রহণের পর বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
