ভৈরবে ৭ মাসের শিশু হত্যা: ১৬ দিন পর ঘাতক পিতা গ্রেপ্তার

র‌্যাব-১৪ ভৈরব ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার শাহজাহান জানিয়েছেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মানিকদী এলাকায় অভিযান চালিয়ে মেরাজ মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মেরাজ স্বীকার করেছেন যে, তিনি তাঁর সাত মাস বয়সী শিশু সন্তান মোজাহিদকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন। গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে বিকেল ৪টার দিকে তাকে ভৈরব থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পারিবারিক কলহ ও মাদকাসক্তির প্রভাব

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্র অনুসারে, মেরাজ মিয়া দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। এই মাদকাসক্তি ও পারিবারিক আর্থিক বিষয় নিয়ে স্ত্রী তাসলিমা বেগমের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত কলহ চলত। ঘটনার কয়েক দিন আগে শিশু মোজাহিদ অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসার খরচ এবং আনুষঙ্গিক পারিবারিক বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। ধারণা করা হচ্ছে, এই দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি ও কলহের জেরেই মেরাজ নিজ সন্তানকে হত্যার মতো নৃশংস সিদ্ধান্ত নেন।


অন্তর্ধান ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য ঘটনা

তদন্তে জানা যায়, ঘটনার দিন অসুস্থ মোজাহিদকে চিকিৎসার কথা বলে নিজের সঙ্গে নিয়ে যান মেরাজ মিয়া। এরপর থেকেই পিতা ও পুত্র উভয়েই নিখোঁজ হয়ে যান। তাসলিমা বেগম সন্তানের খোঁজ করলে মেরাজ বিভিন্নভাবে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মাদকাসক্ত মেরাজ হয়তো শিশুটিকে বিক্রি করে দিয়েছেন।

সন্তান ও স্বামীর কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হয়। দীর্ঘ ১৬ দিন পর গত ১৬ এপ্রিল সকালে মানিকদী পূর্ব কান্দা এলাকার একটি বিলের মধ্যে স্থানীয়রা এক শিশুর মরদেহ ভাসতে দেখেন। খবর পেয়ে ভৈরব থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে। পরবর্তীতে মা তাসলিমা বেগম মরদেহটি তাঁর সন্তান মোজাহিদের বলে শনাক্ত করেন।


আইনি পদক্ষেপ ও তদন্তের অগ্রগতি

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর মা তাসলিমা বেগম বাদী হয়ে স্বামী মেরাজ মিয়াকে প্রধান আসামি করে মোট পাঁচজনের বিরুদ্ধে ভৈরব থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থেকেই মেরাজ পলাতক ছিলেন। ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) লিমন বোস জানিয়েছেন, র‌্যাবের সহায়তায় মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মেরাজ হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কারো প্ররোচনা বা সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে মেরাজকে আদালতে সোপর্দ করে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হতে পারে।


সামাজিক উদ্বেগ ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া

মাত্র সাত মাস বয়সী এক দুগ্ধপোষ্য শিশুকে তার জন্মদাতা পিতার হাতে প্রাণ দিতে হওয়ার ঘটনায় পুরো ভৈরব এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মাদকাসক্তির ভয়াবহতা এবং পারিবারিক কলহ নিরসনে সামাজিক সচেতনতার অভাবকে এ ধরনের অপরাধের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। তাঁরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই বিচার সম্পন্ন করে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

বর্তমানে শিশু মোজাহিদের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে দাফন করা হয়েছে। তাসলিমা বেগম তাঁর সন্তানের হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার বাকি আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে তাঁদের আইনের আওতায় আনার জন্য নিয়মিত অভিযান ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।